নিজস্ব প্রতিবেদক,
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার মিঠাপুর-মথুরাপুর-পাহাড়পুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস যেন ঘুষ বাণিজ্যের আখড়া। অভিযোগ উঠেছে, ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা রাসেল হোসেন ঘুষ ছাড়া কোনো সেবা দিচ্ছেন না। জমির খাজনা থেকে শুরু করে নামজারি, রেকর্ড সংশোধন সবক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা না দিলে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সেবাপ্রত্যাশীরা। জমি সংক্রান্ত সেবা নিতে গেলে যেন নাগরিকদের জন্য নতুন এক দুঃস্বপ্ন অপেক্ষা করছে।
স্থানীয় মিঠাপুর-মথুরাপুর-পাহাড়পুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসটি পরিণত হয়েছে ঘুষ বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে। দায়িত্বে থাকা ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) রাসেল হোসেনের বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ।
সরকারের রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তরটিকে ব্যক্তিগত আখড়ায় পরিণত করেছেন রাসেল। অভিযোগ অনুযায়ী, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে খাজনার পরিমাণ ইচ্ছেমতো কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ক্ষতি হলেও ওই কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখো টাকা।
ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে আসে রীতিমতো ভয়ঙ্কর চিত্রঃ
স্থানীয়দের অভিযোগ, খাজনার রশিদে প্রথমে টাকার অঙ্ক অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখান রাসেল হোসেন। পরে ঘুষ নিলে অনলাইনে কমিয়ে দেন প্রকৃত টাকার অঙ্ক। টাকা না দিলে মাসের পর মাস হয়রানি, ফাইল আটকে রাখা আর সীমাহীন ভোগান্তি ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
ভুক্তভোগী ফাতেমা বেগম ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, আমার কাছে প্রথমে ২৮ হাজার টাকা দাবি করা হয়। দিতে না পারায় পরে ২০ হাজার ঘুষ দিলে খাজনা রশিদে লেখা হয় ৫৭২ টাকা। আমি যখন অবশিষ্ট টাকা ফেরত চাই, তখন রাসেল সাফ জানিয়ে দেয়, আমরা কম নিচ্ছি বলেই টাকাটা আর ফেরত হবে না। এটা কেমন অবিচার?
অন্যদিকে স্থানীয় কৃষক সুজাউল জানান, তিন খতিয়ানের জন্য ৬৯ হাজার টাকার রশিদ দেখানো হয়। পরে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিলে ৫ হাজার ৮৪২ টাকার অনলাইন রশিদ হাতে পান। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার টাকার হিসাব কে দেবে? প্রতিদিন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই রাসেল।
সরজমিনে তদন্তে গিয়েও বিপাকে পড়েছেন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানা তদন্তে গেলে ভুক্তভোগীদের তোপের মুখে পড়েন উপ সহকারী তহশীলদার রাসেল হোসেন। অথচ ঘটনার প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
রাসেল হোসেনের অতীতও কর্মস্থলও বিতর্কে ভরা। নওগাঁ সদরের দুবলহাটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্বে থাকাকালে তার ঘুষ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে একাধিক সংবাদ প্রকাশ হলে তাকে বদলি করা হয় বদলগাছীতে। বদলি হয়ে বদলগাছীতে এসেও একই কায়দায় গড়ে তুলেছেন অনিয়ম-দুর্নীতির সাম্রাজ্য।
এবিষয়ে উপজেলা ভূমি অফিসের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানা স্যার তদন্ত করছেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি বলেন, তদন্ত প্রক্রিয়াধীন আছে। সঠিক অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানা সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরজমিনে গিয়েছিলাম। তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
প্রশাসনের আশ্বাস বারবার শোনা গেলেও ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ চলছে কেন? রাসেলের মতো কর্মকর্তারা দায়িত্বে থেকে কিভাবে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব খেয়ে নিচ্ছে এবং মানুষকে হয়রানী করছে?
জনগণের চোখে এখন বদলগাছীর ভূমি অফিসগুলো পরিণত হয়েছে দুর্নীতি ও ঘুষের আঁতুড়ে ঘরে। ভুক্তভোগীরা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, দ্রুত শাস্তি না হলে এই দপ্তরকে জনগণের আস্থা থেকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শহীদুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক : ফরহাদ হোসেন
০১৭২৫-৭৩৬৩৫৩, ০১৬০২-৯০৩৬২১ / ০১৭৭০-৪৯৪৯৮১
ঢাকা কার্যালয়ঃ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ ডাকবাংলোপাড়া, বদলগাছী, নওগাঁ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ গণ সংবাদ২৪