আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি:
এডহক কমিটি গঠন নিয়ে একের পর এক মন্দ নাটকীয়তা যেন পিছু ছাড়ছে না নওগাঁর রাণীনগরের ত্রিমোহনী উচ্চ বিদ্যালয়ের। ১৯৮৬সালে প্রতিষ্ঠিত আদর্শ এই বিদ্যাপিঠটি বর্তমানে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ অপরাজনীতি ও সভাপতি নামক পদের যাতাকলে পড়ে সুনাম হারিয়ে দুর্নামের পাল্লায় ডুবতে বসেছে। এতে করে বিদ্যালয়ে পাঠদানের সুন্দর পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি ভাবে বিদ্যালয়ের সার্বিক ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অভিভাবকরা।
বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ এমন রাজনীতির দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ হিসেবে বিদ্যালয়ের ছয়টি পদে নিয়োগ এবং কিছু সংখ্যক অযোগ্য শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতাকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। বর্তমানে উপজেলার টপ অফ দ্যা সাবজেক্টে পরিণত হয়েছে ত্রিমোহনী উচ্চ বিদ্যালয়। দীর্ঘদিন চলে আসা এমন নানা সমালোচিত ঘটনার কারণে প্রতিবছরই কমছে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা।
সূত্রে জানা গেছে আ’লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ অপরাজনীতির অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরপর ব্যবস্থাপনা কমিটিতে অযোগ্য ব্যক্তিদের প্রবেশ করানোর পর থেকে শুরু হয় বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়া। একের পর এক নাটকীয়তা চলতে থাকে। এছাড়া দীর্ঘদিন যাবত পূর্ণাঙ্গ ভাবে একজন দক্ষ ও চৌকস প্রধান শিক্ষক না থাকার সুযোগে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দিন দিন আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। ২০০৩সাল থেকে ২০১০সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা তাদের দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। এরপর ২০২৩সাল পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দয়ারাম সাহা। যিনি তৎকালীন আ’লীগের নেতাদের আদেশের বাহিরে কোন কিছুই করতে পারেননি। অপরদিকে গত ২০১৫সালের পর থেকে পর্যায়ক্রমে বিদ্যালয়ে সৃষ্ট হওয়া নৈশ্য প্রহরী, আয়া, নিরাপত্তাকর্মী, অফিস সহায়ক, প্রধান শিক্ষক ও সহকারি প্রধান শিক্ষক এই ছয়টি পদে নিয়োগে প্রায় কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের স্বপ্ন বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের সঙ্গে তৎকালীন এমপিদের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় অভ্যন্তরীণ সেই দ্বন্দ্বকে আরো কঠিন করে তোলে।
এরপর প্রধান শিক্ষক দয়ারাম সাহার চাকরী শেষে নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে বিদ্যালয়ের জুনিয়র সহকারি শিক্ষক শহিদুল ইসলাম প্রায় দেড় বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর গত বছরের ৫আগস্টে পরিবর্তনের পর দ্বন্দ্বের নাটকীয়তা মোড় নেয় অন্য দিকে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নতুন করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো: আব্দুল মোত্তালিব। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করার পর গত বছরের ডিসেম্বর মাসের ২৬তারিখে এডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা পেলে স্থানীয়দের অংশগ্রহণে প্রকাশ্যে একটি সেমিনারের মাধ্যমে আহ্বায়ক পদসহ পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্য হিসেবে প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করেন। এরপর থেকে আরো ভিন্ন রকমের নতুন নাটকীয়তা শুরু হয়। প্রথম দিকে সমঝোতার ভিত্তিতে আহ্বায়ক পদে তিনজন প্রার্থী তাদের আবেদন জমা দেন। এরপর থেকে হঠাৎ করেই কোন এক পক্ষের ইন্ধনে প্রথম প্রার্থী, বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মকলেছুর রহমান বাবুকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেয়প্রতিপন্ন করে বিভিন্ন লেখালেখি শুরু করলে শুরু হয় কাঁদা ছোড়াছুড়ি। পাল্টাপাল্টি নিউজ এবং নিউজের প্রতিবাদসহ নানা নাটকীয়তা বর্তমানে বিদ্যালয়টিকে উপজেলাসহ পুরো জেলাজুড়ে নেতিবাচক সমালোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত করেছে। ফলে পাঠদানের সুন্দর পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কারণে প্রতিদিনই শিক্ষার্থী হারাচ্ছে বিদ্যালয়টি। এমন নোংরা অপরাজনীতির দৈন্যদশা থেকে মুক্ত করে পাঠদানের জন্য একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবশে ফিরিয়ে আনতে দ্রুতই প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্বভার গ্রহণের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
স্থানীয় অভিভাবকরা জানান এক সময় অবহেলিত এই অঞ্চলে শিক্ষা প্রদানে আলোকবর্তিকা হিসেবে আলো ছড়িয়ে এসেছে এই বিদ্যালয়টি। কিন্তু আ’লীগ সরকারের সময় এবং তার কিছু সময় আগে কিছু অযোগ্য মানুষ অনিয়মের মধ্যদিয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার পর থেকে নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিদ্যালয়ের সুষ্ঠ পরিবেশ নষ্ট হতে শুরু হয়। এরপর একজন দক্ষ প্রধান শিক্ষকের অভাবতো রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষকদের নানা অপকর্মের অসুস্থ প্রতিযোগিতা আজ বিদ্যালয়টিকে পুরোপুরি ধ্বংস করেছে আর এর সঙ্গে রয়েছে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির পদটি পাওয়ার যুদ্ধ। যদি দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে একটি সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনা না যায় তাহলে বিদ্যালয়টি দ্রুতই শিক্ষার্থী শূন্য হয়ে পড়বে।

বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রবীর কুমার পাল জানান এই স্কুল থেকে এক সময় আমরা স্বপ্ন দেখতে শিখেছি এবং বুয়েট, কুয়েট, ডুয়েট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সুনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বর্তমানে শিক্ষকদের ভিতরে কাঁদা ছোড়াছুড়ি, কোচিং বাণিজ্য আর সভাপতি পদ দখলের নোংরামি আমাদের ছোট ভাই-বোনদের অন্ধকারে পতিত করছে। বাংলাদেশের অন্যান্য বিদ্যালয়ে পরীক্ষার রেজাল্ট দিলে সবাই হিসাব করে কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে, আর আমাদের স্কুলে হিসাব করে কতজন পাশ করেছে। আমি মনে করি সভাপতি পদটি সম্পন্নরূপে সেচ্ছাশ্রম, অলাভজনক এবং সম্মানের একটি পদ। প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে এটাই আশা করবো যে, এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় অতিদ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো: আব্দুল মোত্তালিব জানান এডহক কমিটির আহ্বায়ক পদে আবেদন পাওয়ার পর তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেন। এরপর থেকে শুরু হয় নানা নাটকীয়তা। ভুলবুঝে এক পক্ষ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মিথ্যে অপবাদ দিয়ে আসছে। কিন্তু এই বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকদের করণীয় কিছুই নেই। নানা কারণে তিলে তিলে গড়ে তোলা বিদ্যালয়ের সুনাম আজ হারাতে বসেছে। সকল নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে বর্তমান অবস্থা থেকে বিদ্যালয়কে মুক্ত করতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বভার গ্রহণ করার কোন বিকল্প নেই। তা না হলে বিদ্যালয়ে শুধু শিক্ষক আর কর্মচারীরা থাকবেন কোন শিক্ষার্থী থাকবে না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রাকিবুল হাসান জানান ত্রিমোহনী উচ্চ বিদ্যালয়ের এমন অচল অবস্থার কথা ডিসি স্যারকে জানালে স্যারের নির্দেশনা মোতাবেক দ্রুতই সেখানে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বভার প্রদান করা হবে। বিদ্যালয়ে পাঠদানের একটি সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বন্ধ করতে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং তা পুরোপুরি বাস্তবায়নে প্রশাসন বদ্ধ পরিকর।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শহীদুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক : ফরহাদ হোসেন
০১৭২৫-৭৩৬৩৫৩, ০১৬০২-৯০৩৬২১ / ০১৭৭০-৪৯৪৯৮১
ঢাকা কার্যালয়ঃ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ ডাকবাংলোপাড়া, বদলগাছী, নওগাঁ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ গণ সংবাদ২৪