মশিউর রহমান খান, জয়পুরহাট প্রতিনিধিঃ
জয়পুরহাট শহরে দিন যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে শব্দ দূষণের মাত্রা। বাসস্ট্যান্ড থেকে পাচুর মোড় (জিরো পয়েন্ট) পর্যন্ত শহরের ব্যস্ততম সড়কগুলোতে যানবাহনের অযথা হর্ন বাজানো যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন পথচারী থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকার বাসিন্দারাও। তবে অভিযোগ থাকলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি কয়েক দিন সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ে, আর সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে হর্নের বিকট শব্দ। আন্তজেলা বাস, ট্রাক, পিকআপ, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের চালকেরা প্রয়োজন ছাড়াই হর্ন বাজাচ্ছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্যমতে, ৪০-৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ সহনীয় হলেও ৬০ ডেসিবেলের বেশি হলে তা ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় ৭০ ডেসিবেলের বেশি শব্দে থাকলে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত শব্দ হৃদরোগী ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
শহরের জামান প্রি-ক্যাডেট স্কুলের এক অভিভাবক আইরিন সুলতানা বলেন, “সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়ার সময় হর্নের শব্দে এতটাই সমস্যা হয় যে কানে হাত দিয়ে রাখতে হয়। শিশুদের জন্য এটি খুবই ক্ষতিকর।”
নতুনহাট এলাকার বাসিন্দা আবু রায়হান বলেন, “বিশেষ করে সাপ্তাহিক গরুর হাটের দিনে ভটভটির শব্দ অসহনীয় হয়ে ওঠে। এভাবে চলতে থাকলে মানুষ শ্রবণ প্রতিবন্ধী হয়ে পড়বে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক অটোরিকশা ও ভটভটিতে অবৈধভাবে উচ্চ শব্দের হর্ন ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এগুলোর বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না।
ক্ষেতলাল উপজেলার বাসিন্দা আলাল হোসেন বলেন, “এটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা শুধু প্রশাসনেরই আছে। সাধারণ মানুষের কিছু করার নেই।” তবে দায়ভার শুধু প্রশাসনের নয় বলে মনে করেন সমাজকর্মীরা।
গণমাধ্যমকর্মী ওমর আলী বাবু বলেন, “আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।”
জয়পুরহাট বিএড কলেজের প্রভাষক নুরুজ্জামান লিটন বলেন, “শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব চালক তৈরি করা দরকার, যা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
আইনজীবী আরাফাত হোসেন মনে করেন, দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানোর প্রবণতা কমবে।
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ জয়পুরহাট জেলা সংগঠনের সভাপতি নুর আলম বলেন, “শব্দ দূষণ এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। যেখানে হর্ন নিষিদ্ধ, সেখানেও তা মানা হচ্ছে না।”
জয়পুরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আল মামুন বলেন, “দীর্ঘদিন শব্দ দূষণের মধ্যে থাকলে শ্রবণশক্তি হ্রাস, মাইগ্রেন, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।”
এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা বলেন, “অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ট্রাফিক ইন্সপেক্টর জামিরুল ইসলাম বলেন, “আগে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হলেও এখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
যদিও আইন রয়েছে- শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী অপরাধে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান আছে, তবুও বাস্তবে এর প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, শব্দ দূষণের এই বাড়বাড়ন্ত ঠেকাতে দায়িত্ব নেবে কে? প্রশাসন, নাকি সচেতনতা- নগরবাসী এখন এর কার্যকর সমাধানই দেখতে চান।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শহীদুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক : ফরহাদ হোসেন
০১৭২৫-৭৩৬৩৫৩, ০১৬০২-৯০৩৬২১ / ০১৭৭০-৪৯৪৯৮১
ঢাকা কার্যালয়ঃ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ ডাকবাংলোপাড়া, বদলগাছী, নওগাঁ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ গণ সংবাদ২৪