লালমনিরহাট প্রতিনিধি:
রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীর তিস্তা নদীবেষ্টিত ১০টি সংসদীয় আসনের লক্ষাধিক ভোটার এবারও নির্বাচনের কেন্দ্রে এনে দিয়েছে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। লালমনিরহাটের তিনটি, কুড়িগ্রামের তিনটি, রংপুরের দুটি, নীলফামারীর একটি এবং গাইবান্ধার একটি আসনের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর ইশতেহারেই রয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি।
বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা এই প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। তিস্তাকে ঘিরে তিস্তাপাড়ের ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে প্রার্থীরা নদীঘেঁষা চরাঞ্চলে নির্বাচনী সভা, উঠান বৈঠক ও গণসংযোগ চালিয়েছেন।
এদিকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রংপুর ও নীলফামারীর নির্বাচনী জনসভায় ঘোষণা দিয়েছেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর জনসভায় বলেছেন, ‘জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সবার আগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে।’
কিন্তু বছরের পর বছর প্রতিশ্রুতি শুনে তিস্তাপাড়ের মানুষের মধ্যে জমেছে ক্ষোভ ও হতাশা। অনেকেই বলছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন তাদের কাছে ‘মুলা ঝুলানো’ গল্পে পরিণত হয়েছে। ভোট এলেই তিস্তা আলোচনায় আসে, ভোট শেষ হলে আবার হারিয়ে যায়।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার চর গোকুন্ডা এলাকার কৃষক মহির উদ্দিন (৭০) জানান, রাজনীতিবদিরা তাদের সাথে শুধুই প্রতারনা করছেন। অন্তর্বতী সরকারও তাদের সাথে প্রতারনা করেছে। অন্তর্বতী সরকার ঘোষনা দিয়ে বলেছিল ‘২০২৬ সালে জানুয়ারী মাসে তিস্তা হহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে’ কিন্তু তা করেনি। এখন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের মুখে শুধু প্রতিশ্রুতি শোনা যাচ্ছে। বাস্তবে তারা ভোট নেওয়ার কৌশল হিসেববে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের গল্পকে বেছে নিয়েছেন।
’তিস্তা হামাকগুরাক শ্যাষ করি ফ্যালাইছে। এ্যালাং হামাকগুলাক স্বপন দ্যাখায়। হামরাগুলা স্বপ্ন দ্যাখতে দ্যাখতে ক্লান্ত হয়া গ্যাছি। এবার হামরাগুলা দ্যাখি শুনি ভোট দিমো,’ তিনি বলেন।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার চর গোবর্ধান এলাকার কৃষি শ্রমিক মনোয়ারা বেওয়া (৫৮) জানান,’ হামার জমাজমি বাস্তভিটা সোগে তিস্তার প্যাটোত চলি গ্যাইছে। হামরাগুলা এ্যালা কামলা দিয়া সংসার চালাই। তিস্তাক বাঁচার গল্পগুলা বিশ বছর ধাকি শুনি আইসবার নাইকছি কিন্তু এ্যালাং কাইও কিছুই করিল না।’ ‘ভোট আইসছে। এ্যালা সবাইগুলা হামারগুলার কাছে আইসে আর ভোট চায়। সবাইগুলা কয় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করি দিবে। মোর কাছে এ্যাইল্যা মিছা কথা বলি মনে হয়,’ তিনি বলেন।

রংপুরে কাউনিয়া উপজেলার চর মধুপুর এলাকার কৃষক শেহের আলী (৬৫) জানান, এখন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন তাদের কাছে ‘মুলা ঝুলা’ গল্পের মতোই মনে হচ্ছে। অন্তর্বতী সরকারের সময় সম্ভবনা বেশি ছিলো কিন্তু এ সরকারের সময় সেটা হলো না। আদৌ তিন্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে বলে মনে হচ্ছে না। ‘রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা তিস্তাকে রাজনীতির ‘ট্রাম কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করে তিস্তাপাড়ের মানুষের সাথে ছলনা করছেন,’ তিনি বলেন।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার চর পশ্চিম বজরা এলাকার কৃষক হারাধন চন্দ্র বর্মণ (৬৫) বলেন,’ হামার ত্রিশ বিঘা জমি তিন্তার প্যাটোত পড়ি আছে। হামরা এ্যালা খাবার জোটবারে পাই না। তিস্তা নদী খুঁড়লে হামার জমিগুলা জাগি উঠবে।’ ‘সবাই খালি প্রতিশ্রুতি দ্যায়। কাইও আর কাজ করি দ্যায় না। এ্যালা ভোট আইসছে হামারগুলা কাছে ভেছাট চাবার নাইকছে। সবাইগুলা কয় এবার নাতি তিস্তা নদীক বাঁচাই। মিছা কথা শুনতে শুনতে হামারগুলার কান ঝালাপালা হয়া গ্যাইছে। ভোট এবার দ্যাখি শুনি দিমো,’ তিনি বলেন।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার চর খড়িবাড়ী এলাকার কৃষক আতিয়ার রহমান (৫৫) জানান, তিস্তা নদী রক্ষায় সকল আন্দোলনে তারা অংশগ্রহন করেছিলেন। আশা করেছিলেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে কিন্তু তাদের আশা দুরাশায় পরিনত হয়েছে। তারা চরমভাবে হতাশ। ভোট আসলে তিস্তাপাড়ের মানুষের গুরুত্ব বেড়ে যায়। ‘হামরাগুলা ভাইববার নাইকছি যাই ক্ষমতায় গ্যাইলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কাজ করির পাইবে তাকে হামরা ভোট দিমো। হামরাগুলা কিছুই চাই না। হামরা শুধু তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন দেখবার চাই’, তিনি বলেন।
লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী–কালীগঞ্জ) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফিরোজ হায়দার লাভলু বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন আমাদের দলের স্পষ্ট অঙ্গীকার এবং আমার নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান বিষয়।’
লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসনের বিএনপি প্রার্থী ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘তিস্তা নদী রক্ষার আন্দোলনে আমি রাজপথে ছিলাম। তিস্তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর। জনগণের রায়ে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে—এটা দলের প্রতিশ্রুতি ও আমার ইশতেহার।’
রংপুর-৪ (কাউনিয়া–পীরগাছা) আসনের এনসিপি প্রার্থী আখতার হোসেন বলেন, ‘আমি তিস্তাপাড়ের সন্তান। তিস্তার দুঃখ-কষ্ট আমি হাড়ে হাড়ে জানি। ১১-দলীয় জোট সরকার গঠন হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এটা আমার নির্বাচনী অঙ্গীকার।’
সব মিলিয়ে তিস্তাকে ঘিরে প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি থাকলেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় কাটেনি তিস্তাপাড়ের মানুষের। তাদের প্রশ্ন একটাই—এই নির্বাচনেও কি তিস্তা থাকবে শুধু ভোটের স্লোগান হয়ে, নাকি সত্যিই শুরু হবে বহু প্রতীক্ষিত মহাপরিকল্পনার কাজ।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শহীদুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক : ফরহাদ হোসেন
০১৭২৫-৭৩৬৩৫৩, ০১৬০২-৯০৩৬২১ / ০১৭৭০-৪৯৪৯৮১
ঢাকা কার্যালয়ঃ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ ডাকবাংলোপাড়া, বদলগাছী, নওগাঁ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ গণ সংবাদ২৪