
মানব সভ্যতার ইতিহাসে ধর্মের অপব্যাখ্যা ও অন্ধ উগ্রতার অনেক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত রয়েছে। সম্প্রতি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে 'তৌহিদি জনতার' নামে যেভাবে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে এনে আগুনে পোড়ানো হলো, তা শুধু ইসলামবিরোধী নয় বরং অমানবিকও বটে। কুরআন-হাদিসের আলোকে এর কোনো সমর্থন নেই, বরং সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে। অথচ যারা নিজেদের ‘ধর্মপ্রাণ’ বলে দাবি করে, তারাই ইসলামকে কলঙ্কিত করার নোংরা কাজ করেছে।
প্রথমেই প্রশ্ন, নুরাল পাগলার দোষ কী ছিল? বলা হলো, তিনি নাকি নিজেকে ইমাম মাহদি দাবি করেছিলেন। অথচ বাস্তবে তিনি কোনোদিনই সরাসরি এমন দাবি করেননি, বরং ইমাম মাহদীর প্রশংসায় গান গাইতেন। ধরা যাক, তিনি সত্যিই নিজেকে মাহদি দাবি করলেন, তাতেও তার প্রতি এ বর্বর আচরণের অনুমোদন ইসলামে নেই। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“কোনো প্রাণকে হত্যা করো না, আল্লাহ যাকে হারাম করেছেন, ন্যায্য কারণ ছাড়া।” (সুরা আল-ইসরা, ১৭:৩৩)
ন্যায্য কারণ বলতে বোঝানো হয়েছে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচার প্রক্রিয়ার অধীনে ফয়সালা, কোনো গোষ্ঠী বা মব বা ভিড়তন্ত্রের হাতে নয়।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
“কোনো মুসলমানের রক্ত হালাল নয়, যদি না সে রাষ্ট্রীয় বিচারের মাধ্যমে তিনটি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়…” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
কিন্তু এখানে কী ঘটল? ভিড়ের উন্মাদনা, ধর্মের ভুয়া ব্যাখ্যা আর উগ্র আবেগের নামে একটি মৃতদেহকে কবর থেকে টেনে বের করে পুড়িয়ে ফেলা হলো! এর চেয়ে ভয়াবহ জুলুম, নৃশংসতা, বর্বতা আর কী হতে পারে? ইসলাম মৃতদেহের সম্মান রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। হাদিসে এসেছে:
“মৃত মুসলমানের অস্থি ভাঙা, জীবিত অবস্থায় অস্থি ভাঙার সমান।” (সুনান আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)
অর্থাৎ মৃতের লাশের ওপর জুলুম জীবিতের ওপর জুলুমের মতোই অপরাধ। সেখানে কবর খুঁড়ে লাশ বের করে পোড়ানো কেবল অপরাধ নয়, বরং ইসলামবিদ্বেষী বর্বরতা।
তাহলে কারা বর্বরতা এই নৃশংসতা করল? ইসলামের শত্রুরাও এ ধরনের লাশ পোড়ানোর নৃশংসতা কখনো দাবি করেনি। এরা হল তথাকথিত ‘তৌহিদি জনতা’ যারা ইসলামকে ঢাল বানিয়ে উগ্রতা, প্রতিহিংসা আর অপরাজনীতি চর্চা করে এরা মানুষের মনে ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চায়। ইসলামের সৌন্দর্য, সহনশীলতা আর যুক্তির জায়গায় তারা দাঁড় করিয়েছে আগুন, হিংস্রতা, নৃশংসতা আর ভণ্ডামি। ইসলাম কখনোই এসব অনুমোদন দেয় না। তাদের কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট হয়ে গেছে, এরা নবী করীম (সাঃ) এর দাওয়াতি আদর্শ নয়, বরং জাহেলিয়াত যুগের হিংস্রতা পুনর্জীবিত করছে।
আজ প্রয়োজন পরিষ্কারভাবে বলা, নুরাল পাগলার ভুল থাকলেও তার বিচার কেবল আদালতের কাজ অথবা তাঁর রবের কাজ। কিন্তু যেভাবে তথাকথিত তৌহিদি জনতা নামীয় একদল ধর্মান্ধ, উগ্রচিন্তার মানুষ লাশের ওপর বর্বরতা চালাল, তা কুরআন-হাদিসের সরাসরি অমান্য করা। এরা আসলে ইসলামের মুখোশধারী ভন্ড, যারা আল্লাহর দীনকে কলুষিত করছে।
রাষ্ট্র ও সমাজকে এদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় আগামীতে যে কেউ কারও ওপর “ধর্ম অবমাননার” মিথ্যা অভিযোগ তুলে ভিড়তন্ত্রের নামে একই ধরনের জুলুম, অত্যাচার, বর্বরতা ও নৃশংসতা চালাবে এবং ইসলাম ও মানবতার নামে কলঙ্ক ডেকে আনবে।
আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, ধর্মের নামে এ বর্বরতা কোনোভাবেই ইসলাম নয়, বরং ইসলামবিদ্বেষ। আর যারা এ কাজ করেছে, তারা মুসলিম নামধারী হলেও প্রকৃত অর্থে ইসলামবিরোধী অপরাধী। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব, ধর্মের নামে আর কোনো বর্বরতা, নৃশংসতার সুযোগ না দেওয়া।
(শহীদুল ইসলাম)
প্রকাশক ও সম্পাদক : শহীদুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক : ফরহাদ হোসেন
০১৭২৫-৭৩৬৩৫৩, ০১৬০২-৯০৩৬২১ / ০১৭৭০-৪৯৪৯৮১
ঢাকা কার্যালয়ঃ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ ডাকবাংলোপাড়া, বদলগাছী, নওগাঁ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ গণ সংবাদ২৪