নিজস্ব প্রতিবেদক
নওগাঁর ধামইরহাটে হালিমা বেগম (৬৫) নামে এক বৃদ্ধার ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। মামলা দায়েরের এক দিনের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নিহতের ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি ও ওড়না জব্দ করেছে পুলিশ।
গত ১৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ধামইরহাট উপজেলার ছিলিমপুর (তালবোনা) গ্রামের একটি বাঁশঝাড়ের পাশে ধানখেতের আইলে হালিমা বেগমের মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে মরদেহটি পড়ে ছিল। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তাঁর শরীরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের আলামত পাওয়া যায়। তাঁর এক কানের লতি কাটা এবং অপর কানের লতি ছেঁড়া ছিল।
এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর ধামইরহাট থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করা হয়। এরপর নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরিফুল ইসলাম ও ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিন্টু রহমানের নেতৃত্বে বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়।
পুলিশ জানায়, স্থানীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও তদন্তের ভিত্তিতে ১৯ অক্টোবর গভীর রাতে ধামইরহাট উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নে অভিযান চালানো হয়। প্রথমে নিহতের ছোট ভাই মজনু রহমান (৫৬) ও তাঁর স্ত্রী হোসনে আরাকে (৪২) গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বস্তাবর গ্রামের রবিউল ইসলাম (৩৯) এবং ছিলিমপুর গ্রামের হামিদুর রহমান (৫৫) ও মোশারফ হোসেনকে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত রশি ও ওড়না জব্দ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে পুলিশ জানায়, হালিমা বেগম ছিলেন নিঃসন্তান ও স্বামী পরিত্যক্তা। প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি বাবার বাড়িতে ছোট ভাই মজনুর বাড়ির পেছনে টিনের ছাপড়া দিয়ে তৈরি একটি ছোট ঘরে বসবাস করতেন। একটি গরু, তিনটি ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন এবং অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। নিজের জমানো টাকা বড় ভাইয়ের ছেলে রুবেলের কাছে রাখতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, হালিমার গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, কানের দুল ও জমিজমা নিয়ে আসামিদের মধ্যে লোভ ও বিরোধ ছিল। ছোট ভাই মজনু ও তাঁর স্ত্রী হোসনে আরাকে টাকা না দেওয়া নিয়ে হালিমার সঙ্গে মাঝেমধ্যে বিরোধ হতো। এ ছাড়া মজনুর বাড়িতে আসা-যাওয়া করা কয়েকজনের কর্মকাণ্ড নিয়েও আপত্তি ছিল তাঁর।
অন্যদিকে, গ্রেপ্তার রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ জানায়, মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হালিমার সঙ্গে রবিউলের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। হামিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেনের সঙ্গেও তাঁর পূর্ববিরোধ ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের দাবি, এসব বিরোধ ও সম্পদের প্রতি লোভ থেকেই ছোট ভাই মজনু ও তাঁর স্ত্রী হোসনে আরার পরিকল্পনায় পাঁচজন মিলে হালিমা বেগমকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনার প্রায় পাঁচ দিন আগে তাঁরা হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা অনুসারে ১৮ অক্টোবর দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে হামিদুর রহমান হালিমা বেগমকে তাঁর ঘর থেকে ডেকে বের করেন। পরে অন্যরা মিলে তাঁর মুখ চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে একটি খড়ের পালার পেছনে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর হাত রশি দিয়ে বেঁধে গলা চেপে ধরে পরিহিত ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
হত্যার পর কানের দুল নেওয়ার উদ্দেশ্যে হামিদুর রহমান হালিমার এক কানের লতি কেটে দেন এবং অপর কানের লতি ছিঁড়ে ফেলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর মরদেহ গোপন করার উদ্দেশ্যে হামিদুর, রশিদুল ও রবিউল মিলে মরদেহটি সরিয়ে বাঁশঝাড়ের ওপারে ফেলে রাখেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে মরদেহের হাতের বাঁধন খুলে রশি ফেলে দেওয়া হয়। হত্যায় ব্যবহৃত ওড়নাটি নিহতের মুখের ওপর ঢেকে দেন তাঁর ছোট ভাই মজনু। এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান বলে পুলিশের ভাষ্য। নিহতের এক কানের দুল মজনু এবং অপরটি হামিদুর নিয়ে নেন বলেও তদন্তে জানা গেছে।
নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলায় অপরাধ দমন ও প্রতিরোধের পাশাপাশি অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সর্বাত্মক তৎপর রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার তারই অংশ।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শহীদুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক : ফরহাদ হোসেন
০১৭২৫-৭৩৬৩৫৩, ০১৬০২-৯০৩৬২১ / ০১৭৭০-৪৯৪৯৮১
ঢাকা কার্যালয়ঃ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ ডাকবাংলোপাড়া, বদলগাছী, নওগাঁ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ গণ সংবাদ২৪