নওগাঁ প্রতিনিধি
ভোরের কর্মচাঞ্চল্য তখনও থামেনি। প্রতিদিনের মতো চালকলে ধান সিদ্ধের কাজে ব্যস্ত ছিলেন শ্রমিকেরা। হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। মুহূর্তেই কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চালকল। আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন শ্রমিকেরা। ধোঁয়া কাটার পর চাতালে পড়ে থাকতে দেখা যায় আব্দুল খালেককে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
বুধবার সকালে নওগাঁ সদর উপজেলার হাঁপানিয়া এলাকার হাজি ইসারত আলী চালকলে বয়লার বিস্ফোরণে ঘটে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এতে আব্দুল খালেক (৪৫) নিহত এবং আরও চার শ্রমিক আহত হয়েছেন। আহতদের নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
নিহত আব্দুল খালেক হাঁপানিয়া পাড়া এলাকার বছির উদ্দিনের ছেলে।
বিকট শব্দ, এরপরই ধোঁয়ায় অন্ধকার
শ্রমিক ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে চালকলে ধান সিদ্ধের কাজ চলছিল। একপর্যায়ে বয়লারটি বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণের পর বয়লারের বিভিন্ন অংশ ও ইট ছিটকে পড়ে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এতে কয়েকজন শ্রমিক আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শী নারী শ্রমিক হামিদা বেগম বলেন, বিস্ফোরণের পর চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া কমলে তাঁরা খালেককে পড়ে থাকতে দেখেন।
তাঁর অভিযোগ, চাতালে শ্রমিকদের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা নেই। শ্রমিকদের দাবি, জীবিকার জন্য কাজ করতে গিয়ে যেন জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে, সে জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।
মালিক পলাতক, উঠছে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পর চালকলের মালিক ঘটনাস্থল থেকে চলে গেছেন এবং পরে তাঁর আর সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
এ ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে- চালকলের বয়লারটি কী অবস্থায় ছিল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো কি না এবং শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না। তবে এসব প্রশ্নের কোনোটি এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা ও তদন্তের আগে বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত মন্তব্য করাও সম্ভব নয়। পুলিশও জানিয়েছে, তদন্ত শেষ হলে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
হামিদা বেগম বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়। চাতালগুলোতে আমাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। আমরা নিরাপত্তার সঙ্গে কাজ করতে চাই।’
একজন শ্রমিকের মৃত্যুর পর তাঁর এই বক্তব্য শুধু একটি দুর্ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং চালকল ও চাতালগুলোতে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
নওগাঁ সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রেজাউল করিম বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত করছে। কী কারণে বয়লার বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা তদন্ত শেষে বলা যাবে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে নিহত আব্দুল খালেকের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এখন তদন্তেই পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষা, এটি নিছক যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত দুর্ঘটনা, নাকি বয়লার রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল। সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে এই মৃত্যুর দায় কতটা দুর্ঘটনার আর কতটা অবহেলার।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শহীদুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক : ফরহাদ হোসেন
০১৭২৫-৭৩৬৩৫৩, ০১৬০২-৯০৩৬২১ / ০১৭৭০-৪৯৪৯৮১
ঢাকা কার্যালয়ঃ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ ডাকবাংলোপাড়া, বদলগাছী, নওগাঁ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ গণ সংবাদ২৪