
রাজধানীর উত্তরা এলাকার মাইলস্টোন স্কুলে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাটি নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনাগত ব্যর্থতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতার নগ্ন উদাহরণ। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে ঘটে যাওয়া এই ভয়ংকর দৃশ্য কেবল তাদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করেনি, বরং গোটা জাতিকে নাড়া দিয়েছে।
বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্কুলের মাঠে বিধ্বস্ত হয়। এতে প্রশিক্ষক নিহত হন এবং প্রশিক্ষণার্থী গুরুতর আহত হন। ভাগ্যের জোরে বড় ধরণের প্রাণহানি না হলেও এর ভয়াবহতা প্রশ্নাতীত। এ ধরনের দুর্ঘটনা কোনোভাবেই "দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা" হিসেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না।

প্রশাসনিক দায় এড়ানো যাবে না, প্রশিক্ষণ বিমানের ওড়ার রুট কীভাবে একটি ব্যস্ত আবাসিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানঘন এলাকায় নির্ধারণ করা হলো, এ প্রশ্ন আজ জনমনে তীব্রভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি (CAAB), বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি ও স্থানীয় প্রশাসনের কেউই কি বিষয়টি আঁচ করতে পারেননি? বিশেষত একটি স্কুলের উপর দিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ বিমান ওড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে কেন? এ দায় বিমান বাহিনী, প্রতিরক্ষামন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা এড়াতে পারে না। এঘটনায় প্রকৃতপক্ষে কতজন নিহত হয়েছে সেই সংখ্যা জাতি এখনও জানতে পারেনি। এখন তো রাজনৈতিক কোনও দল ক্ষমতায় নেই, তাই নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশে কোনও কারচুপি করার কারণ দেখি না। এর সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করে জনমনে তৈরী বিভ্রান্তি দূর করা সরকারের দায়িত্ব।
শুধু যান্ত্রিক ত্রুটি বলেই দায় সারা যাবে না। এটি গভীরভাবে নীতিগত ও কৌশলগত ভুলের ফল। দুর্ঘটনার মূল কারণ নির্ধারণ করতে হলে অবশ্যই শীর্ষপর্যায়ের একটি নিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞ-সমন্বিত তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য: একটি অবহেলিত বিষয় এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সরাসরি শিকার হয়েছে শিশুরা, যাদের অনেকে এখনো আতঙ্কে স্কুলে ফিরতে চাচ্ছে না। অনাকাঙ্ক্ষিত, সহিংস দৃশ্য তাদের শৈশব স্মৃতিতে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে। সুতরাং এখনই স্কুল পর্যায়ে ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানীদের মাধ্যমে মানসিক কাউন্সেলিং চালু করা জরুরি। অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন করাও প্রয়োজন, যেন তারা শিশুদের পাশে থেকে তাদের আতঙ্ক কাটাতে সহায়তা করেন।
পরামর্শ ও করণীয়ঃ
এই ঘটনায় আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরছি, যা ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে:
১. স্বচ্ছ তদন্ত ও দায় নির্ধারণ: ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ ও দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তদন্ত রিপোর্ট গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে।
২. নতুন বিমান চলাচল নীতিমালা: ঘনবসতিপূর্ণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানঘন এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
৩. উড়োজাহাজ নিরাপত্তা জোরদার: প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ বিমান অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। নতুন ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. মনোসামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা: ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি কাউন্সেলিং এবং তাদের অভিভাবকদের জন্য সহায়ক পরামর্শ কার্যক্রম চালু করতে হবে।
৫. ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন: নিহত ও আহতদের যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
৬. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণ: রাজধানীর সব স্কুল-কলেজের জন্য আলাদা নিরাপত্তা মানদণ্ড নির্ধারণ করে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা হচ্ছে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে অবহেলা মানে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার পথে বাধা সৃষ্টি করা। মাইলস্টোন স্কুলের দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, আমরা এখনও অনেক ক্ষেত্রেই উদাসীন। এখনই সময়, দায়সারা তদন্ত নয়, বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের। সুশাসনের অন্যতম সূচক হলো নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই ঘটনায় সেটির চরম ব্যত্যয় ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে পরবর্তী বিপর্যয় হয়তো আরও ভয়াবহ হবে।
✍️ সম্পাদক গণ সংবাদ
প্রকাশক ও সম্পাদক : শহীদুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক : ফরহাদ হোসেন
০১৭২৫-৭৩৬৩৫৩, ০১৬০২-৯০৩৬২১ / ০১৭৭০-৪৯৪৯৮১
ঢাকা কার্যালয়ঃ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ ডাকবাংলোপাড়া, বদলগাছী, নওগাঁ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ গণ সংবাদ২৪