মো. পাভেল রহমান, রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে লেখা ছিল ব্যথানাশক ওষুধ। কিন্তু সেই ওষুধের পরিবর্তে ফার্মেসি থেকে দেওয়া হয়েছে ক্যান্সারের ওষুধ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভুল ওষুধ সেবনের পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে বর্তমানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন নওগাঁ সদর উপজেলার গাংজোয়ার গ্রামের আখের আলী মন্ডল (৬০)।
ঘটনাটি ঘটেছে রাণীনগর উপজেলার ত্রিমোহনী বাজারের ইসলামিয়া মেডিকেল হল নামের একটি ফার্মেসিতে। ভুক্তভোগীর পরিবার এ ঘটনায় ফার্মেসির মালিকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ জুলাই আখের আলী রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাজুর কাছ থেকে চিকিৎসা নেন। ফেরার পথে ত্রিমোহনী বাজারের ইসলামিয়া মেডিকেল হল থেকে ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ কিনতে যান। অভিযোগ, ফার্মেসির কর্মচারী ব্যবস্থাপত্রে থাকা Methoflex এর পরিবর্তে Methotrex 10 mg (Methotrexate BP 10 mg) দেন।
ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী আখের আলী ওই ওষুধ দিনে তিনবার সেবন করতে থাকেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। শরীরে সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পাশাপাশি মুখ ও গলায় গুরুতর ঘা (মিউকোসাইটিস) তৈরি হয়। একপর্যায়ে পানি পর্যন্ত গিলতে না পেরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। পরবর্তী সময়ে রক্তের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উপাদান কমে গিয়ে তাঁর pancytopenia দেখা দেয়।
পরিবারের দেওয়া একটি CBC রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁর Hemoglobin ৮.৬ g/dL, WBC ৬৪০/cumm এবং Platelet ৪৬,০০০/cumm পাওয়া যায়। বিশেষ করে WBC অত্যন্ত কমে যাওয়ায় গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। পরে Bone Marrow Examination-এ hypoactive marrow পাওয়া যায় এবং প্রতিবেদনে ‘most possibility of aplastic anaemia’ উল্লেখ করা হয়।
আখের আলীর বড় ছেলে রাসেল হোসেন বলেন, “ওষুধ একজন মানুষের বাঁচার উপায়, আবার ভুল ওষুধ মৃত্যুর কারণও হতে পারে, আমরা বাবার মাধ্যমে তা বুঝেছি। ফার্মেসিতে ব্যবস্থাপত্র বোঝে না এমন কর্মচারী দিয়ে ওষুধ বিক্রি করা জঘন্য অপরাধ। কয়েক লাখ টাকা খরচ করে বাবার চিকিৎসা করাতে পারায় তিনি এখন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরছেন। তবে তিনি আর আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তাঁর মাথার চুল ও দাড়ি উঠে গেছে, শরীরে বড় বড় ক্ষত হয়েছে। কোনো দরিদ্র মানুষের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটলে অর্থের অভাবে হয়তো তাঁর মৃত্যু হতো।” তিনি ফার্মেসির মালিকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাজু বলেন, খবর পেয়ে তিনি রোগীর বাড়িতে গিয়ে দেখেন, ব্যবস্থাপত্রের ওষুধের পরিবর্তে ক্যান্সারের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, তিনি দ্রুত সেখানে না গেলে রোগী মারা যেতে পারতেন। পরে ফার্মেসিতে গিয়ে বিষয়টি জানালে মালিক কর্মচারীদের ভুলের ওপর দায় চাপান। তিনি বলেন, প্রতিটি ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্টের তদারকিতে ওষুধ বিক্রি নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যবস্থাপত্র সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা কর্মচারীদের দিয়ে ওষুধ বিক্রির কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের ফার্মেসির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ফার্মেসির মালিক আবু রায়হান বলেন, তাঁর দোকানের কর্মচারী ভুল করে এক ওষুধের পরিবর্তে অন্য ওষুধ দিয়েছেন। তিনি রোগীর বাড়িতে গিয়ে ক্ষমাও চেয়েছেন। তবে কর্মচারীদের তদারকি না করে কেন তাঁদের মাধ্যমে ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে এ প্রশ্নের পর তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।
বাংলাদেশ কেমিস্টস্ অ্যান্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতির রাণীনগর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের পিন্টু বলেন, আইন অনুযায়ী ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্টের মাধ্যমে ওষুধ বিক্রি করতে হয়। কোনো ফার্মেসির মালিক নিজে ফার্মাসিস্ট হলে তাঁর তদারকিতে অন্য কর্মচারী ওষুধ বিক্রি করতে পারেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে সমিতির পক্ষ থেকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কেএইচএম ইফতেখারুল আলম খান অংকুর বলেন, ফার্মেসি থেকে ভুল ওষুধ বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। ফার্মাসিস্টের তদারকিতে ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে ওষুধ বিক্রি করতে হবে। ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে ফার্মেসির মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, একটি ভুল ওষুধের কারণে আখের আলীর জীবন এখন সংকটাপন্ন। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও মানুষ এমন ভুলের শিকার হতে পারেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শহীদুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক : ফরহাদ হোসেন
০১৭২৫-৭৩৬৩৫৩, ০১৬০২-৯০৩৬২১ / ০১৭৭০-৪৯৪৯৮১
ঢাকা কার্যালয়ঃ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ ডাকবাংলোপাড়া, বদলগাছী, নওগাঁ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ গণ সংবাদ২৪