নিজস্ব প্রতিবেদক,
“এক সাগর রক্তের বিনিময়ে/বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না” এই গান বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে গভীর আবেগে। তবে স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এসে সেই আবেগে নতুন করে আঘাতের অভিযোগ বিস্তর। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা, হত্যা, লাঞ্ছনা ও দখলচেষ্টার একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন আসে। এর পর থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৪-২০২৩ সালে ১০ বছরে ৩৫টি ঘটনায় ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত ও ৫৯ জন আহত হন। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ২৫টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছেন।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার একটি ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর রংপুরের তারাগঞ্জে। সেদিন বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় (৭৫) ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায় (৬০) এর রক্তাক্ত মরদেহ নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও তদন্ত এখনো চলমান।
এর আগে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই কানুকে মারধর করে গলায় জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়। এর আগে ১৯ আগস্ট ও ২ সেপ্টেম্বর তাঁর বাড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটে। অপমানের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। মামলার আসামিরা দ্রুত জামিন পাওয়ায় পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে; বর্তমানে কানু এলাকা ছেড়ে চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন।
২০২৫ সালের ১৮ জুলাই দিনাজপুরের খানসামায় ফজরের নামাজে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হন মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন সরকার। দুই সপ্তাহ চিকিৎসার পর ৬ আগস্ট তিনি মারা যান। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাতে টাঙ্গাইলে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বাসভবনে মুখোশধারীদের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ শরীয়তপুরে মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশিদ সিকদার ও তাঁর ছেলেদের ওপর হামলা হয়। ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা এ বি এম শামসুল আলমের বাড়িতে চাঁদা না পেয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা তরিকুল আলম অপদস্থ হন। ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর রাজধানীতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমানকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়; পরে তাঁকেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
অন্যান্য ঘটনার মধ্যে রয়েছে-
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট যশোরে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক মোল্লার বাড়িতে হামলা; ৮ সেপ্টেম্বর বরগুনায় মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশিদ মিয়ার প্রকাশ্যে লাঞ্ছনা; ২১ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধায় খগেন্দ্রনাথ প্রামাণিকের ওপর কুপিয়ে হামলা; ৪ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভাঙচুরে বাধা দিতে গিয়ে নাসির মিয়ার লাঞ্ছনা।

২০২৫ সালের ঘটনাগুলোর মধ্যে আছে- ১ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় আব্দুর রহমানের ওপর হামলা; ৭ জানুয়ারি টাঙ্গাইলে আইয়ুব খানকে গ্রেপ্তার; ৫ মার্চ নারায়ণগঞ্জে মুছা মিয়ার ওপর হামলা; ১ জুন নীলফামারীতে আব্দুল জব্বারের ওপর হামলা; ২২ জুন উত্তরায় কে এম নূরুল হুদাকে লাঞ্ছনা; ১৬ সেপ্টেম্বর সোনারগাঁয়ে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমানের ওপর হামলা; ৬ অক্টোবর পঞ্চগড়ে শাহাদুল ইসলামের লাঞ্ছনা; ২৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বাড়ি দখলচেষ্টা এবং ১৯ নভেম্বর টাঙ্গাইলে আশরাফ আলী তালুকদারের জমি দখলের অভিযোগ।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনায় কোথাও রাজনৈতিক বিরোধ, কোথাও জমিজমা বা চাঁদাবাজির বিষয় জড়িত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে কেন্দ্র করে হামলার প্রবণতা উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকাশক ও সম্পাদক : শহীদুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক : ফরহাদ হোসেন
০১৭২৫-৭৩৬৩৫৩, ০১৬০২-৯০৩৬২১ / ০১৭৭০-৪৯৪৯৮১
ঢাকা কার্যালয়ঃ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
আঞ্চলিক কার্যালয়ঃ ডাকবাংলোপাড়া, বদলগাছী, নওগাঁ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬ গণ সংবাদ২৪