
নিজস্ব প্রতিবেদক
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে চরম হয়রানি ও বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এবার সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পন্ন হওয়া ‘পে-ফিক্সেশন-২০২৬’ এর দাপ্তরিক কাজকে কেন্দ্র করে প্রায় ৭০০ শিক্ষকের কাছ থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে দেওয়ার দোহাই দিয়ে প্রকাশ্যে এই অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষকদের ‘পে-ফিক্সেশন-২০২৬’ এর কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। ডিজিটাল এই পোর্টালে জনপ্রতি কাজ সম্পন্ন করতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগে। অথচ বদলগাছী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে দ্রুত কাজ সম্পন্ন ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে ‘চা-পানি’ দেওয়ার অজুহাতে প্রতি শিক্ষকের কাছে ২০০ টাকা করে দাবি করা হয়। বাধ্য হয়ে প্রায় ৭০০ শিক্ষক শিক্ষকপ্রতি ২০০ টাকা হারে টাকা দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রাথমিক শিক্ষা অফিস যেন ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইলই নড়াতে চায় না। এক ভুক্তভোগী শিক্ষক বলেন, “আমার ও আমার শিক্ষিকা স্ত্রীর পে-ফিক্সেশনের জন্য ৪০০ টাকা গায়ের জোরে নেওয়া হয়েছে।” অন্য এক শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, “অনলাইনে নিজের কাজ নিজেই করার সক্ষমতা আমার আছে। তবুও অফিস ফি-এর নামে এই টাকা দিতে বাধ্য করা হয়েছে, না দিলে ফাইলে জট লাগিয়ে রাখার হুমকি থাকে।”
অভিযোগের মূল তীর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী জিয়ার দিকে। শিক্ষকদের দাবি, তাঁর মাধ্যমে সব লেনদেন পরিচালিত হয়। প্রথম দিকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও, লেনদেনের ছবি দেখানোর পর সুর পাল্টান অফিস সহকারী জিয়া। তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় শিক্ষক সমিতির এক প্রভাবশালী নেতার নির্দেশেই তিনি এ টাকা সংগ্রহ করেছেন।
তবে শিক্ষা অফিসের এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে বদলগাছী উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা জানান, পে-ফিক্সেশনের জন্য হিসাবরক্ষণ অফিস কোনো টাকা নেয়নি এবং সরকারি কোনো নিয়মেই এসব কাজে অর্থ আদায়ের বিধান নেই।
শিক্ষকরা জানান, শুধু পে-ফিক্সেশনই নয়; বদলগাছী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে শিক্ষকদের বদলি, পেনশন ফাইল পাস, জিপিএফ উত্তোলন কিংবা সাধারণ ফাইলে স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে বা অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রশাসনিক নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। পরিণতি বা প্রশাসনিক রোষানলের ভয়ে সাধারণ শিক্ষকরা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
একটি সরকারি শিক্ষা দপ্তরে দিনের পর দিন এমন খোলামেলা অর্থ বাণিজ্য ও জিম্মি দশায় ক্ষুব্ধ উপজেলার সাধারণ শিক্ষকমহল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অসাধু এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করলে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।
Leave a Reply