নিজস্ব প্রতিবেদক,
২০১৪ থেকে ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে টানা তিনটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের পর এবারের ভোটকে ঘিরে প্রত্যাশা ভিন্ন। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এ নির্বাচন যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য না হয়, তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে তাদের ধারণা, তরুণ, নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবারের নির্বাচনে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ছিল নানা বিতর্ক। বিরোধী দলগুলোর অনুপস্থিতি বা আংশিক অংশগ্রহণে সেসব নির্বাচন পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠেনি। ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ।
মাঠের জরিপে দেখা যাচ্ছে বলেন, এবারের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। শহর থেকে গ্রাম, সব জায়গায় ভোটের আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে, যা গত তিন নির্বাচনে ছিল না। তাঁর মতে, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে এখন পর্যন্ত বড় প্রশ্ন ওঠেনি, ফলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগও সীমিত।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ ভোটার প্রায় ৪ কোটি ৩২ লাখ। এই বিপুলসংখ্যক তরুণের বড় অংশই এবার প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, গত কয়েকটি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারা তরুণ প্রজন্ম যাদের ‘জেন-জি’ বলা হয়-এবার ফল নির্ধারণে বড় নিয়ামক হতে পারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণ ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে। তাঁদের ভোটচিন্তা প্রথাগত দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে ব্যক্তি, ইস্যু ও জবাবদিহিতাকে গুরুত্ব দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রতীক নয়, প্রার্থীই হতে পারেন বিবেচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ভোটের হার নিয়েও আছে আলোচনা। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪২ শতাংশ। বিএনপিসহ ১৬টি দল সে নির্বাচন বর্জন করেছিল। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়ার হার দেখানো হয় ৮০ শতাংশ; তবে ওই নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ হিসেবে সমালোচিত। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভোট পড়েছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ছিল ৮৭ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং ২০০১ সালে ছিল ৭৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ যে দুই নির্বাচনে বড় দলগুলো অংশ নিয়েছিল।
ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে ভোটের হার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে, যা তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত। তাঁর মতে, উচ্চ ভোটার উপস্থিতি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম সূচক হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের মডেলে এবার নির্বাচন হবে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি মনে করেন, তরুণদের পাশাপাশি নারী ও সংখ্যালঘু ভোটাররাও ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রবাসীদের প্রথমবারের মতো ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় নির্বাচনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
তবে শঙ্কার কথাও তুলে ধরছেন অনেকে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেন, আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও দলটির একটি অংশ ভোট বর্জনের আহ্বান জানাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে গুজব ছড়ানোর চেষ্টার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর আশঙ্কা, এতে কিছু ভোটার কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
বিশ্লেষকদের অভিমত, ভোটের নিরাপত্তা, গণনার স্বচ্ছতা এবং ফল ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা এখন নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সম্ভাবনায় ভোটের মাঠে ফিরেছে আলোচনা ও প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, তা অনেকটাই নির্ভর করছে তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ ও আস্থার ওপর।









Leave a Reply