
লালমনিরহাট প্রতিনিধি:
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও মহান শহীদ দিবসে দেশের সর্বত্র শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে দেশাত্মবোধক গান ও শ্রদ্ধাঞ্জলিতে। বিশেষ করে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি তোমায় ভুলিতে পারি গানটি যেন এ দিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এবার লালমনিরহাট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জেলা প্রশাসনের আয়োজিত কর্মসূচিতে কোনো দেশাত্মবোধক গান বাজানো হয়নি—এ নিয়ে সুধীজন, সাংস্কৃতিককর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। তবে অনুষ্ঠানে মাইকের ব্যবস্থা থাকলেও তা ছিল কার্যত অব্যবহৃত। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে স্থাপিত দুটি মাইক নীরব থাকায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে আসা মানুষজন বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হন।সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শহীদ মিনারে জড়ো হন বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের মানুষ। তারা জানান, শহীদ দিবসে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে দেশাত্মবোধক গান না বাজানো নজিরবিহীন এবং দুঃখজনক। অনেকেই এটিকে দায়িত্বে অবহেলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি অমনোযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), সাংস্কৃতিককর্মী ও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমবেত কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, গানটি পরিবেশন করেন। এতে উপস্থিতদের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
লালমনিরহাট জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি ক্যাপ্টেন (অব.) আজিজুল হক বীর প্রতীক বলেন, শহীদ মিনারে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মাইকে দেশাত্মবোধক গান না বাজানোয় আমি গভীরভাবে মর্মাহত। মহান শহীদ দিবসের চর্চায় এমন উদাসীনতা আমাদের ইতিহাস, সংগ্রাম ও সংস্কৃতির ওপর এক ধরনের কালো ছায়া ফেলে।
তিনি আরও বলেন, মহান শহীদ দিবসে দেশাত্মবোধক গান শুধু সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা নয়—এটি আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে জাগ্রত করে, নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে এবং দেশের প্রতি ও মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে।
সনাক সদস্য ও সাংস্কৃতিককর্মী সুপেন দত্ত বলেন, “১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন না হলে আমরা হয়তো আজ বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারতাম না। যারা মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের স্মরণে শহীদ মিনারে দেশাত্মবোধক গান বাজানো একটি ন্যূনতম সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা।”
তিনি অভিযোগ করেন, “জেলা প্রশাসন অনুষ্ঠান আয়োজন করলেও ভাষা আন্দোলনের শহীদদের নিয়ে কোনো গান বাজানো হয়নি—এটি অত্যন্ত হতাশাজনক।
লালমনিরহাট সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সূফী মোহাম্মদ বলেন, “আমি সকালে শহীদ মিনারে এসে দেখি মাইকের ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু কোনো গান বাজানো হচ্ছে না। শহীদ দিবসে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের স্মরণে দেশাত্মবোধক গান বাজানো হবে—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। এটি কেবল গান নয়, আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।” শহীদ মিনারে দেশাত্মবোধক গান বাজেনি এজন্য তিনি জেলা প্রশাসককে দায়ী করেন।
সাংস্কৃতিক কর্মী রিয়াজুল হক বলেন, “অতীতে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ দেশাত্মবোধক গানে মুখর থাকত। এবছরই প্রথম এমন পরিস্থিতি দেখলাম। প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলাম।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করার পর ফোন ধরে তিনি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমি বিষয়টি দেখতেছি।” পরবর্তীতে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি একই মন্তব্য পুনরাবৃত্তি করেন।
Leave a Reply