
নিজস্ব প্রতিনিধি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এর সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং অতীত অবস্থানের তুলনা টেনে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশি রাজনীতিতে তিনি এক ধরনের ব্যতিক্রমী উদাহরণ। গত তিন বছরে তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এই সময়ের মধ্যে প্রতিটি সরকারের সময়েই তাঁর বক্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক সুর লক্ষ্য করা গেছে।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত করেছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই সরকারের পতন ঘটে। এরপর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন উপদেষ্টাকে শপথও পড়ান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন ছাত্রনেতা তখন উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিলেও তাঁদের অনেকেই শুরু থেকেই রাষ্ট্রপতির অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
এদিকে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন সংসদ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংসদে বিরোধী আসনে বসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রনেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি।
এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বিশেষ গুরুত্ব পায়। ভাষণে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে তিনি দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং শেখ হাসিনার শাসনামলকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলে আখ্যা দেন। ভাষণে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিরোধী আন্দোলনে নির্যাতনের ঘটনাও তুলে ধরা হয়।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানাতে দেখা যায়। তবে ভাষণ চলাকালে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সঙ্গে দুই বছর আগের অবস্থানের তুলনা টেনে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি তৎকালীন নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। সে সময় বিএনপি ও জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছিলেন, একটি মহল সহিংসতা সৃষ্টি করে গণতন্ত্রের পথে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তখন তিনি ভাষণ শেষ করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ বলে। তবে এবার তাঁর ভাষণের শেষ শব্দ ছিল ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ সাধারণত সরকার বা মন্ত্রিসভা প্রস্তুত করে এবং রাষ্ট্রপতি সংসদে তা পাঠ করেন। এরপর সেই ভাষণের ওপর সংসদে আলোচনা হয়। তবে এবারের সংসদ গঠিত হয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে দীর্ঘ সময়ের শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এদিকে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করার সময়ও বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা ছিল। তিনি ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এর আগে তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে দুর্নীতি দমন কমিশন এর কমিশনার ছিলেন।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে রয়েছেন। তবে বর্তমান সরকার তাঁকে কত দিন দায়িত্বে রাখবে এ নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ইতিমধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি তাঁর অভিশংসনের দাবি তুলেছে।
এদিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে সংসদেও উত্তেজনা দেখা যায়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালে বিরোধী দলের কিছু সদস্য প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত সংসদের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া হয়। তবে এবারের ভাষণ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রপতির ভাষণ কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই থাকবে, নাকি এতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদধারীর নিজস্ব অবস্থানও প্রতিফলিত হবে।
Leave a Reply