
বিশেষ প্রতিবেদক
বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা তিন ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে জাতীয় সংসদে অবশেষে মুখ খুললেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। কিন্তু তাঁর ব্যাখ্যা যতটা বিতর্ক নিরসনের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল, সমালোচকদের মতে তা উল্টো আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে- রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নিরপেক্ষতা ছিল, নাকি ক্ষমতার বলয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব অস্বীকার করার চেষ্টা?
সংসদে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ নাম দুটি তাঁর সন্তানদের নাম অনুসারে নয়; একটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় এবং অন্যটি দূরবর্তী হওয়ায় এমন নামকরণ হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, দেশে আরও বহু প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় এসব নাম ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ‘সীমান্ত ও দিগন্ত’ নাম রয়েছে উল্লেখ করে শাহে আলম বলেন, ‘মিরাকেলি আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে ঠিকই। আমাদের সন্তানের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত, মীর দিগন্ত। আমার যদি ইনটেনশন থাকত, তাহলে জেলা প্রশাসককে বলতাম ‘নাম রাখেন মীর সীমান্ত, না হলে মীর দিগন্ত’। কিন্তু নামের আগে তো মীর নেই।’
সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা এ সময় টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান প্রতিমন্ত্রীকে। মীর শাহে আলম তখন বলেছেন, ‘আল্লাহ বাঁচাইছে যে মাননীয় সংসদ সদস্য বলেনি যে বিজিবির সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড, ওটা আমার ব্যাংক। উনি দয়া করে যে বলেননি খুলনা থেকে পার্বতীপুরে যে ট্রেন যায় সীমান্ত এক্সপ্রেস, সেটিও আমার ট্রেন। বা উনি দয়া করে বলেননি যে গুলশান ১-এ যে দিগন্ত টাওয়ার রয়েছে, সেটিও আমার।’
কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। নামের ব্যাখ্যা যতই ভৌগোলিক বা প্রশাসনিক হোক, বাস্তবতা হচ্ছে- নামগুলো তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি মিলে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বার্থসংঘাতের আশঙ্কা এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা, জনপরামর্শের নথি বা বিকল্প নাম বিবেচনার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল কি?
বিরোধী দলের বক্তব্যে সংসদে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সেটি কেবল একটি নাম নিয়ে নয়; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নামকরণ কি জনগণের ইতিহাস, ভূগোল ও সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে হবে, নাকি ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিগত পরিচয়কে ঘিরে ব্যাখ্যা তৈরি হবে এ প্রশ্নই সামনে এসেছে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে রসিকতার সুরও ছিল। তিনি বলেন, যদি উদ্দেশ্য সন্তানদের নামে রাখা হতো, তবে নামের আগে ‘মীর’ যোগ করা হতো। অর্থাৎ মীর সীমান্ত, মীর দিগন্ত। কিন্তু সমালোচকদের পাল্টা যুক্তি, প্রশ্ন নামের বানান নয়, প্রশ্ন হচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নৈতিকতা ও জনআস্থার মানদণ্ড।
রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে কেবল আইনি বৈধতা নয়, নৈতিক দূরত্বও গুরুত্বপূর্ণ এমন মত দিয়েছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের ভাষ্য, যেখানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা পারিবারিক সুবিধার সন্দেহ তৈরি করে, সেখানে ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা।
প্রশ্ন তাই এখনো রয়ে গেছে, এটি কি নিছক কাকতালীয় নাম নির্বাচন, নাকি প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতার অভাবের উদাহরণ?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনপদের নাম শুধু মানচিত্রের বিষয় নয়; এটি জনগণের মালিকানা, পরিচয় এবং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার প্রতীক।
Leave a Reply