
বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি
দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১২ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার তিনটি দাখিল মাদ্রাসার এবারের ফলাফলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন।
মাদ্রাসা তিনটি হলো গোঁবরচাপাহাট আখতার হামিদ দাখিল মাদ্রাসা, জোলাপাড়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও খাদাইল দাখিল মাদ্রাসা। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, তিন প্রতিষ্ঠানেই এবার পাসের হার শূন্য।
এর মধ্যে গোঁবরচাপাহাট আখতার হামিদ দাখিল মাদ্রাসা থেকে একজন, জোলাপাড়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে তিনজন এবং খাদাইল দাখিল মাদ্রাসা থেকে আটজন পরীক্ষায় অংশ নেন। তিন প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ১২ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছেন।
এ ফলাফল সামনে আসার পর মাদ্রাসাগুলোতে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানগুলোর কোথাও কোথাও নিয়মিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপস্থিতি নেই। কয়েকটি কক্ষও দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী বা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
গোঁবরচাপাহাট আখতার হামিদ দাখিল মাদ্রাসার স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ও রাহেল বলেন, কয়েক বছর ধরে মাদ্রাসাটিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়মিত দেখা যায় না। বিভিন্ন কক্ষে আগাছা জন্মেছে। তাঁদের ভাষ্য, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

তবে মাদ্রাসাটির ভারপ্রাপ্ত সুপার মো. কামরুজ্জামান বলেন, প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানো হয়েছিল। ফল প্রকাশের পর জানতে পেরেছেন, ওই শিক্ষার্থীও অকৃতকার্য হয়েছে।
জোলাপাড়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার স্থানীয় বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম বলেন, মাদ্রাসাটিতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি দেখা যায় না। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।
মাদ্রাসাটির সুপার আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমার মাদ্রাসা থেকে তিনজন দাখিল পরীক্ষা দিয়েছে। তিনজনই ফেল করেছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।’
খাদাইল দাখিল মাদ্রাসার সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এবারই প্রথম তাঁর প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এর আগে এমন ফল হয়নি।
এমপিওভুক্ত না হওয়ায় সংকট
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নূর ইসলাম বলেন, বদলগাছীর নন-এমপিওভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। কেউ কেউ ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠান চালিয়ে গেলেও এখনো এমপিওভুক্ত হননি। তাঁর মতে, শিক্ষকদের এই অনিশ্চয়তার প্রভাব প্রতিষ্ঠানের পাঠদানেও পড়ছে।
চলতি বছর বদলগাছী উপজেলায় মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় ৫৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে ৩২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৭টি দাখিল মাদ্রাসা এবং পাঁচটি ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিউল আলম তিন মাদ্রাসার শূন্য পাসের হার নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। এগুলো নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় সেখানে নিয়মিত পাঠদান হয় কি না, সে বিষয়ে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই।
শুধু ফল নয়, তদারকি নিয়েও প্রশ্ন
একই উপজেলার তিনটি প্রতিষ্ঠানে অংশ নেওয়া সব পরীক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা শুধু শিক্ষার্থীদের ফলাফল দিয়ে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কারণ, একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হওয়া কিংবা ফল খারাপ হওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে। কিন্তু তিনটি প্রতিষ্ঠানের ১২ পরীক্ষার্থীর কেউ পাস না করায় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের মান, শিক্ষক উপস্থিতি, শিক্ষার্থী উপস্থিতি ও প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, বছরের পর বছর শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উপস্থিতি কম থাকলে কিংবা নিয়মিত পাঠদান না হলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কীভাবে চলছে? আর এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের দায়ই বা কে নেবে?
দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে তিন মাদ্রাসার শতভাগ অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি খারাপ ফলাফলের হিসাব নয়। এর মধ্য দিয়ে নন-এমপিওভুক্ত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সংকট, পাঠদানের বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন সামনে এসেছে।
Leave a Reply