
আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি:
একসময় যাত্রাপালা ছিলো গ্রাম বাংলার বিশুদ্ধ বিনোদনের অন্যতম একটি মাধ্যম। ৮০দশকের পর থেকে সুস্থ্য বিনোদনের এই ধারাটি হারিয়ে গেছে। তৎকালীন সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে এক সময়ের জনপ্রিয় যাত্রাদল ছিল নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার ‘রূপশ্রী অপেরা’। সেই সময় যাত্রাদল বলতেই মানুষ বুঝে নিতো বিখ্যাত “রূপশ্রী অপেরা” এর কথা।
বর্তমানে অপসংস্কৃতির বেড়াজালে দেশের এই ঐতিহ্য যাত্রাপালা হারিয়ে গেছে। এর সঙ্গে যারা জড়িত ছিলো তাদের অনেকেই বেঁচে নেই। আর যারা বেঁচে আছেন তাদের সবাই কোন মতে টিকে আছেন। কিন্তু সেই সময় যারা “রূপশ্রী অপেরা” যাত্রাদলের পরিবেশিত যাত্রা দেখেছেন তাদের কর্ণ কুহুরে এখনোও যাত্রার অভিনয় শিল্পীদের ডায়ালগ বেজে ওঠে। চোখে ভেসে ওঠে অভিনয় শৈলী। সেই ঐতিহ্যবাহী যাত্রাদল “রূপশ্রী অপেরা” এর ইতিকথা ও যাত্রাপালার উপর গবেষণামূলক “রূপশ্রী অপেরা” বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও প্রীতি সম্মিলিত অনুষ্ঠিত হয়েছে। বইটি লিখেছেন তরুণ গবেষক ও লেখক মোস্তফা আল মেহমুদ রাসেল। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমি গবেষণা কর্মকর্তা ও প্রাবন্ধিক-গবেষক মামুন সিদ্দিকী।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নওগাঁ শহরের ঐতিহ্যবাহী প্যারিমোহন গ্রন্থাগারের অডিটোরিয়ামে মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন একুশে পরিষদ নওগাঁর সভাপতি এ্যাড. ডিএম আব্দুল বারী। এসময় বক্তব্য রাখেন কবি ও গবেষক আতাউল হক সিদ্দিকী, সাবেক অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম খান, জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এ এস এম রায়হান আলম, রূপশ্রী অপেরা যাত্রাদলের শিল্পী সন্তোষ কুমার দাসসহ অন্যরা। মূল আলোচনক হিসেবে বক্তব্য রাখেন নওগাঁর বদলগাছী সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক রবিউর রফিক। এসময় যাত্রাশিল্পের সাথে জড়িত পরিবারের সদস্য, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সুধিজনরাও উপস্থিত ছিলেন।
যাত্রাশিল্প আমাদের সংস্কৃতি ও এর ঐতিহ্য অনেক পুরোনো। এক সময় গ্রাম বাংলার বিনোদনের মাধ্যম বলা যায় এই যাত্রাশিল্প। যেখানে উচ্চ শব্দ ও চড়া আলোর ব্যবহার এবং অতিনাটকীয় ভাবভঙ্গি ও আবৃত্তির মাধ্যমে যাত্রার উপস্থাপনা করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি নাটক, পালা, পুঁথি ছিলো বিনোদনের মাধ্যম। শীতের রাতে চাদর মুড়ি দিয়ে রাত জেগে গ্রামবাংলার মানুষ যাত্রা দেখায় মজে থাকত। বিশেষ করে দেবি সুলতানা, আনারকলি, মহুয়া সুন্দরী ও কাশেম মালার প্রেম যাত্রা ছিল অন্যতম। দর্শক শ্রোতা নৈতিক মুল্যবোধ, ব্যক্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে যাত্রাপালা প্রভাবিত করতো। কিন্তু বর্তমানে নানা কারণে যাত্রাপালা বিলিন হয়ে গেছে। “রূপশ্রী অপেরা” বইটিতে স্থান পেয়েছে যাত্রার উঠে আসা এবং বিলিন হওয়ার গল্প। যাত্রাপালার সাথে যেসব শিল্পী জড়িত তাদের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বইয়ের লেখক মোস্তফা আল মেহমুদ রাসেল বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়াশোনা করা অবস্থায় স্কুল মাঠে যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়েছিল। স্কুলের আর্থিক সহযোগিতার জন্য ওই যাত্রাপালা আয়োজন করেছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। তখন যে দলটি যাত্রাপালা করেছিল তার নাম ছিল ‘রূপশ্রী অপেরা’। সেদিন রূপশ্রী অপেরা দলের পরিবেশিত ‘একটি পয়সা’ যাত্রাপালাটি দেখে শিশু মনে গভীর দাগ কেটে যায়। অনেক পরে জেনেছি সেই যাত্রা দলটির মূল কর্ণধার খগেন্দ্র নারায়ন লস্করের বাড়ি নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার ভাটকৈ গ্রামে। অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল রূপশ্রী অপেরা নিয়ে একটা কাজ করব। এই বইটাতে রূপশ্রী অপেরা যাত্রা দলটির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও তার কুশীলবদের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশা করি, বইটি সবাইকে আনন্দ দেবে এবং জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাবে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাবন্ধিক ও গবেষক মামুন সিদ্দিকী বলেন, গ্রামের যেসব সাধারণ মানুষ রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মতো বড় বড় লেখকদের লেখা পড়েনি তাঁরা মনুষ্যত্ব বিকাশের প্রেরণা পেয়েছে যাত্রাপালার মতো লোকজ সংস্কৃতি থেকে। যাত্রা হলো বাঙালির অন্যতম সাংস্কৃতিক হাতিয়ার। ‘রূপশ্রী অপেরা’ সেই সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা। রূপশ্রী অপেরা দলটি যাত্রাপালা পরিবেশনের মাধ্যমে মনুষ্যতের সাধনা করে গেছেন। বইটিতে উঠে এসেছে এক সময় বরেন্দ্র অঞ্চলে তমুল জনপ্রিয় ছিল এই যাত্রা দলটি। নব্বইয়ের দশকে যাত্রাদলটি ভেঙে যাওয়ার পর দলটির কুশীলবরা কে কোথায় চলে গেছে, কিভাবে আছেন আমরা তার খোঁজ করিনি। কিন্তু বইয়ের লেখক মোস্তফা আল মেহমুদ বিবেকের তাড়না থেকে, আত্মপরিচয় খোঁজার তাড়না থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি যাত্রা দল রূপশ্রী অপেরার ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে এনেছেন এই বইটির মাধ্যমে। একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাস চর্চার একটি অমূল্য অংশ হয়ে থাকবে গ্রন্থটি।
Leave a Reply