
নিজস্ব প্রতিবেদক,
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জানতে চেয়েছেন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তিন মাস বাংলাদেশে লুকিয়ে থেকে কিভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, উনি কিভাবে জানলেন, তিনি (ওবায়দুল কাদের) তিন মাস লুকিয়ে ছিলেন। আমরা তো জানি না। আমরা যদি জানতাম ধরে ফেলতাম। ওই খবর যদি আমাদের দিতেন লুকিয়ে আছে, অবশ্যই ধরে ফেলতাম। আপনারা একটা উদাহরণ দেন যে কেউ লুকিয়ে আছে আমরা জেনেও তাকে ধরিনি। আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গণঅভ্যুত্থানের পর তিন মাস ৫ দিন তিনি দেশেই ছিলেন। এই সময়ে তিনি নিরাপদেই ছিলেন। দলের সভাপতির মতো তিনিও ভারতে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেছেন এই সময়ে। যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন দলীয় সভাপতির সঙ্গে। সেখান থেকে সাড়া মেলেনি। সূত্রের দাবি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের দেয়া বক্তব্যে যারপরনাই বিরক্ত ছিলেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। “ছাত্রদের আন্দোলন দমাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট” ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যেই আন্দোলনে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছিল বলেই দলটির নেতারা মনে করছেন। যে আন্দোলনের জেরে শেখ হাসিনার সরকারকে এক বিধ্বংসী পরিণতি দেখতে হয়েছে।
সূত্রেরে বরাতে জানা যায়, গত ৮ই নভেম্বর ওবায়দুল কাদের শিলং হয়ে ভারতের কলকাতায় পৌঁছান। খবর রয়েছে, তিনি এক বিশেষ স্থানে আয়েসেই দিন কাটাচ্ছিলেন। তবে কীভাবে দেশ ছাড়বেন তার ফন্দি-ফিকির করছিলেন। সবুজ সংকেত আসার পর সড়কপথে তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় ভারতের মেঘালয়ের রাজধানী শিলং পৌঁছান। সেখান থেকে চলে যান কলকাতা। তবে দিল্লি নয়, কলকাতাতেই তিনি অবস্থান করবেন এমনটাই জানা গেছে। ভারত সরকারের কাছে তার জন্য কেউ কেউ লবিং করছিলেন। এক্ষত্রে শেখ হাসিনা কোনও আগ্রহ দেখাননি।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সরকার পতনের কয়েকদিন আগে থেকে হঠাৎ নীরব হয়ে যান। জনশ্রুতি আছে, আন্দোলন নিয়ে দেয়া বক্তব্যের কারণে তাকে কথা বলতে বারণ করা হয়েছিল দলের সভাপতি শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে। এ সময় দলের অন্য নেতারা গণমাধ্যমে কথা বললেও ওবায়দুল কাদেরকে কথা বলতে দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগের পতনের পর আত্মগোপনে থাকা কয়েকজন নেতা নানা মাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু দলের সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বিবৃতি দেখা যায়নি।
টানা তিন মেয়াদে দলের সাধারণ সম্পাদক হয়ে ওবায়দুল কাদের দলেও নিজস্ব বলয় তৈরি করেছিলেন। এ কারণে দলীয় অনেক নেতাকর্মীও তার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। এ ছাড়া বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে নানা সময়ে বক্তব্য দেয়ায় সাধারণ মানুষের কাছেও বিরক্তিকর ও বিদ্রুপের চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছিল নানা বিদ্রুপ ও ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা।
পরে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরে ওবায়দুল কাদের বাংলাদেশে কোথায় তিনি কিভাবে ছিলেন, কেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বা তিনি কিভাবে বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করেছেন এই ব্যাপারে আদালতের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। যা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিতে আদালত নির্দেশনা দিয়েছে।
এদিকে,ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে ‘গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ’ সংঘটনের অভিযোগে বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করার জন্য মঙ্গলবার দুই মাস সময় দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
কেউ যদি আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও কাউকে পালাতে সাহায্য করেন, তাহলে আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনার নির্দেশে ও পরিকল্পনায় বিভিন্ন সময় ওবায়দুল কাদেরসহ মন্ত্রিপরিষদের বিভিন্ন সদস্য মানুষকে গুম ও হত্যা করতে সরাসরি সাহায্য করেছেন। যাঁরা এই গুমের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন, তাঁদের তথ্য কমিশনের কাছে এসেছে এবং তা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বৈষমবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে গত ১৭ অক্টোবর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। আসামিদের মধ্যে ৯ জন সাবেক মন্ত্রীসহ ১৩ জনকে ১৮ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে শুনানি শেষে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। পাশাপাশি এই মামলার বাকি আসামিদেরও (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকা) ১৭ ডিসেম্বর হাজির করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তারই ধারাবাহিকতায় আজ সকালে আগের ১৩ জনসহ ১৬ জনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
Leave a Reply