
সম্পাদকীয়,
একজন মা, যিনি জীবনভর সংসার বাঁচিয়ে রেখেছেন, সন্তান লালন-পালন করেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মা যদি নিজের স্বামীর গড়া বাড়িতে পা রাখার অধিকার হারিয়ে ফেলেন, তবে আমাদের সমাজব্যবস্থার মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
নওগাঁ শহরের কাজির মোড় এলাকায় ঘটেছে এমনই একটি মর্মান্তিক ঘটনা, যা আমাদের সমাজচিত্রে এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে।
৭০ বছর বয়সী বিলকিস আক্তার নামের ওই বৃদ্ধা দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা ধরে নিজের বাড়ির সামনে বসে থেকেছেন, কারণ তার একমাত্র ছেলে মোস্তাফিজুল ইসলাম সৌরভ বাড়ির গেটে তালা লাগিয়ে তাকে প্রবেশে বাধা দিয়েছে। আর এ ঘটনার পেছনে রয়েছে সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ। স্বামীর মৃত্যুর পর আইনত তিন সন্তান ও মা-সবারই ওই বসতবাড়িতে অংশ থাকার কথা থাকলেও, একমাত্র ছেলে পুরো সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিতে চাপ দিচ্ছেন। মা ও মেয়েরা তাতে সম্মত না হওয়ায় এই সংকটের সৃষ্টি।
ঘটনাটির চেয়েও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো, সন্তান কর্তৃক মায়ের প্রতি অমানবিক আচরণ, এমনকি শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ। ইতিমধ্যেই এই নিয়ে মামলা হয়েছে, অথচ প্রতিকার হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে একজন মা যখন বলেন, “আমি আমার নিজের বাড়িতে ঢুকতে চাই,” তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির আকুতি নয়-তা আমাদের সমাজের ব্যর্থতার জ্বলন্ত দলিল হয়ে ওঠে।
আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে চেয়েছিলাম যেখানে সন্তান হবে মায়ের আশ্রয়স্থল, বার্ধক্যে মা-বাবা পাবেন যত্ন ও শ্রদ্ধা। অথচ এখানে মা হয়ে উঠেছেন ‘জীবনের জন্য হুমকি’। ছেলে বলছেন, “তুই দুই আনার মালিক, তুই পাথারে গিয়ে থাক।” এই অবমাননাকর শব্দ সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো যথেষ্ট হওয়া উচিত।
বসতবাড়ির কাগজে-কলমে অধিকাংশ অংশের মালিক হয়েও বিলকিস আক্তারের তার ঘরে ঠাঁই মিলছে না। এমন ঘটনা কেবল একটি পরিবারে ঘটে যাওয়া বিবাদ নয়, এটি সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয়ের দৃষ্টান্ত। সবচেয়ে বড় কথা, মায়ের প্রতি সন্তানের অকৃতজ্ঞতা।
এই ঘটনায় প্রশাসনের নীরবতা হতাশাজনক। সম্পত্তি আইন এবং প্রবীণ অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী মা হিসেবে তার অধিকার রয়েছে, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ কোথায়? প্রশাসন যদি এমন ঘটনায় সক্রিয় না হয়, তবে এমন নিপীড়নের শিকার আরও অনেক মা আড়ালে-আবডালে নির্যাতিত হতেই থাকবেন।
আমরা চাই, বিলকিস আক্তারের ঘটনায় দ্রুত আইনি হস্তক্ষেপ হোক। একই সঙ্গে প্রয়োজন জনসচেতনতা, সন্তান কর্তৃক মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য ও নৈতিকতা শেখানো হোক পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে।
একজন মা যদি তার নিজের বাড়িতেই আশ্রয় না পান, তাহলে আমাদের পরিবার, সমাজ, আইন-সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত?
(শহীদুল ইসলাম)
Leave a Reply