
সম্পাদকীয়,
(শহীদুল ইসলাম)
বাংলাদেশ আজ এক জটিল ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আসা এই রাষ্ট্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির সাফল্য অর্জন করলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও গণতন্ত্রের গভীর শেকড় এখনো দৃঢ় হয়নি। ফলে জনগণ একদিকে অগ্রগতির স্বাদ পেলেও অন্যদিকে বঞ্চনা, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আটকে আছে।
১. রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণতান্ত্রিক ঘাটতি
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র সূচক (EIU Democracy Index 2024) অনুযায়ী বাংলাদেশ ৫.৯৪ স্কোর নিয়ে ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা আধা-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে তালিকাভুক্ত।
সংসদ নেই, সংসদে বিরোধী দল নেই, ফলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে না।
নির্বাচনকে ঘিরে জনগণের আস্থা ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের ভোটার উপস্থিতি নিয়ে দেশি-বিদেশি প্রশ্ন এখনো তোলা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীলতার অভাবে সংলাপের পরিবেশ গড়ে ওঠেনি।
২. অর্থনীতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালে যেখানে ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২৪ সালের শেষে তা নেমে এসেছে ১৯–২০ বিলিয়নের ঘরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাধারণ মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.৬%-যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংকের (২০২৪) রিপোর্টে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮.৭%, চরম দারিদ্র্যে প্রায় ৫% মানুষ বসবাস করছে। বেকারত্বের হার আনুমানিক ৪.৮%, তবে তরুণ বেকারত্ব ২০% এর কাছাকাছি।
৩. শিক্ষা
ইউনেস্কো (২০২৪) জানায়, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি হার ৯৮% হলেও মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার প্রায় ৩৪%। শিক্ষা বাজেট মোট জাতীয় বাজেটের মাত্র ১.৮% জিডিপি, যেখানে ইউনেস্কোর ন্যূনতম সুপারিশ ৪–৬%। কোচিং ও বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, ফলে শিক্ষা বৈষম্য গভীরতর হচ্ছে।
৪. স্বাস্থ্য
স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় মোট জিডিপির মাত্র ২.৯%, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্নগুলোর একটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, বাংলাদেশে প্রতি ১,০০০ মানুষের বিপরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ০.৭৯ (ভারতে ০.৯, শ্রীলঙ্কায় ১.১)। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকট প্রকট—প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য শয্যা মাত্র ৮টি। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
৫. মানবাধিকার ও আইনের শাসন
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) ২০২৪ রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও রাজনৈতিক দমনপীড়ন এখনো উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অকার্যকারিতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব জনআস্থাকে ক্ষয় করছে। বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি—প্রায় ৪০ লাখ মামলা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
৬. গণমাধ্যম ও নাগরিক স্বাধীনতা
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF) প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স ২০২৪ এ বাংলাদেশ ১৬৯তম স্থানে, যা গণমাধ্যম স্বাধীনতার সংকটকে স্পষ্ট করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও অনুরূপ বিধিনিষেধ সাংবাদিক ও নাগরিকদের মতপ্রকাশে বাধা সৃষ্টি করছে।
এমতাবস্থায় অবশ্যই যা করতে হবে তা হলো-
১. স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন: নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
২. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ: বাজেট বরাদ্দ দ্বিগুণ করা জরুরি।
৪. আইনের শাসন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৫. গণমাধ্যম স্বাধীনতা: মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় কঠোর আইনগত সংস্কার প্রয়োজন।
৬. রাজনৈতিক সংলাপ ও সহনশীলতা: দলগুলোকে সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
শেষ কথা হলো, বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অগ্রযাত্রার পথে থাকলেও গণতন্ত্রের দুর্বল ভিত সব অর্জনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। জনগণ যে গণতন্ত্রের প্রতীক্ষায় রয়েছে তা কেবল ভোটাধিকার নয়-ন্যায়বিচার, সুশাসন, সমতা ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি জনগণের প্রত্যাশাকে অবমূল্যায়ন করে, তবে ইতিহাস তার নির্মম বিচার করবে। তাই আজ প্রয়োজন সত্যিকারের গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা-যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে জনগণ।
Leave a Reply