
পরশুরাম (ফেনী) প্রতিনিধি
ফেনীর সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরামে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এক মসজিদের ইমাম ও মক্তবশিক্ষক শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। দীর্ঘ তদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য- কিশোরীর গর্ভজাত সন্তানের জৈবিক বাবা ওই ইমাম নন, বরং মেয়েটিরই আপন বড় ভাই।
ঘটনার জেরে নির্দোষ দাবি করেও এক মাস দুই দিন কারাভোগ করতে হয়েছে স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম ও মক্তবশিক্ষক মোজাফফর আহমদকে। এ সময় তিনি হারিয়েছেন চাকরি, সামাজিক মর্যাদা এবং মামলার খরচ চালাতে বিক্রি করতে হয়েছে জমিও।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর পরশুরামের বক্স মাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা হনুফা খাতুন তাঁর ১৪ বছর বয়সী মেয়ে রুবি আক্তারকে ধর্ষণের অভিযোগ এনে একই গ্রামের পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে পরশুরাম মডেল থানায় মামলা করেন।
অভিযোগ অস্বীকার করলেও গ্রেপ্তার এড়াতে পারেননি মোজাফফর। পরে অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে তিনি আদালতে পাল্টা মামলা করতে গেলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর তিনি এক মাস দুই দিন কারাভোগ করেন।
তদন্তে জানা যায়, কয়েক বছর আগে মক্তবে পড়াশোনা শেষ করা ওই কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান জন্ম দেন। পরিবারের পক্ষ থেকে এর দায় চাপানো হয় মক্তবশিক্ষক মোজাফফরের ওপর।
মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর মোজাফফর আহমদকে ঢাকার মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পাশাপাশি কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াবও পরীক্ষা করা হয়।
২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি পাওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। ফলে মোজাফফরের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে তুলনা করে কোনো মতামত দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এরপর কিশোরী ও তার সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানকে নিয়ে পুনরায় ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয় পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে কিশোরী স্বীকার করে, তার আপন বড় ভাই মোরশেদ দীর্ঘদিন ধরে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছে। ভাইকে রক্ষার জন্যই ইমাম মোজাফফরকে ফাঁসানো হয়েছিল বলে জানায় সে।
পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে তিনি বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
আদালতের নির্দেশে কিশোরী, তার নবজাতক সন্তান এবং মোরশেদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ৯ আগস্টের ফরেনসিক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুটির সঙ্গে মোরশেদের ডিএনএ মিলেছে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, মোজাফফর আহমদ ওই শিশুর জৈবিক পিতা নন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি। ফলে তাঁকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মোরশেদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ফেনী জেলা কারাগারে আছেন।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, “ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। নিরপরাধ একজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
এ ঘটনার পর মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারান মোজাফফর আহমদ। মামলার ব্যয় মেটাতে বিক্রি করতে হয়েছে পাঁচ শতক জমি। সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ায় মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন তিনি।
মোজাফফর আহমদ বলেন, “শেষ পর্যন্ত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আমি সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছি। কারাভোগ করেছি, চাকরি হারিয়েছি, জমি বিক্রি করতে হয়েছে। আমি ক্ষতিপূরণ চাই।”
তিনি আরও বলেন, “অনেক সময় ইমাম ও মাদ্রাসাশিক্ষকদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানো হয়। সঠিক তদন্ত হলে নিরপরাধ মানুষ রক্ষা পাবে।”
মোজাফফরের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, “ডিএনএ পরীক্ষাই এ মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়েছিল।”
জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম বলেন, “একজন নিরপরাধ ইমামকে অপমান ও কারাভোগ করতে হয়েছে। তাঁর পাশে দাঁড়ানো এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।”
Leave a Reply