
সম্পাদকীয়,
রাজধানীর এক ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন মানুষকে প্রথমে বেধড়ক মারধর, তারপর ধারালো অস্ত্রের আঘাত, শেষে পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যা, এ দৃশ্য শুধু একজন নাগরিকের মৃত্যু নয়, বরং এটি গোটা রাষ্ট্রের নৈতিক মৃত্যু ও বিচারহীনতার নৃশংসতম আলামত। হত্যার পর ঘাতকের প্রকাশ্য উল্লাস যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, এ সমাজে পেশী শক্তিই শেষ কথা, আর রাষ্ট্র ক্রমেই এক নির্লিপ্ত দর্শকে পরিণত হচ্ছে।
নিহত মো. সোহাগ একজন সাধারণ ভাঙারি ব্যবসায়ী। অথচ তাকে হত্যা করেছে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা মাহমুদুল হাসান মহিন, যিনি অতীতে চাঁদাবাজি, হাসপাতাল দখলসহ একাধিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ। আশেপাশে অগণিত মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে এই হত্যাকাণ্ড দেখেছে, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। কারণ সবাই জানে, রাজনীতির আশ্রয়ে থাকা অপরাধীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া।
এ ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আমাদের সমাজে ভয়, বিচারহীনতা এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়, এই তিনের বিষমিশ্রণই সহিংসতার সবচেয়ে বড় প্রজননক্ষেত্র। এদেশে রাজনীতির প্রভাব খাটিয়ে একাল-সেকাল সব কালেই নৃশংসতা করা হয়েছে। যে রাজনীতি মানুষের সেবা ও নিরাপত্তা দিতে পারেনা সেই রাজনীতি থেকে কিছু পাওয়ার আশা করা বৃথা।
একদিকে মানুষ ভীত, কারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বহুক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত থাকে।
অন্যদিকে অপরাধীরা নিশ্চিন্ত, কারণ তাদের পেছনে থাকে রাজনৈতিক ছায়া ও পৃষ্ঠপোষকতা।
আর রাষ্ট্র, যে ন্যায়ের রক্ষক হওয়ার কথা, সে তখন “তদন্ত চলছে” জাতীয় বিবৃতির আড়ালে দায়িত্ব এড়িয়ে চলে।
এ চিত্র নতুন নয়। খুলনার দৌলতপুরে একই দিনে প্রকাশ্যে গুলি করে সাবেক যুবদল নেতাকে হত্যা, চাঁদপুরে মসজিদের ভেতর এক খতিবকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করার ঘটনা দেখায় এগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বিচারহীনতার ধারাবাহিক ফল।
যখন ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হয়, আর অপরাধীরা দলীয় পরিচয়ে আত্মরক্ষা পায়, তখন সহিংসতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এর পরিণাম, রাষ্ট্র ধীরে ধীরে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বদলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক লুটপাট
ও ভয় দেখানোর মঞ্চে পরিণত হয়।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর মানুষ আশা করেছিল, রাষ্ট্র ও রাজনীতি নতুন নৈতিক মানদণ্ডে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কেবল শীর্ষ নেতৃত্বের মুখ বদলেছে, চরিত্র ও সংস্কৃতি বদলায়নি। রাজনৈতিক দলগুলো এখনো অপরাধীর শাস্তির বদলে এক টুকরো বহিষ্কারপত্র দিয়ে দায়মুক্তি খুঁজছে। প্রশাসন অপরাধ দমনের চেয়ে “কে শাসক তার অনুগত” সেটি প্রমাণেই বেশি ব্যস্ত।
প্রশ্ন হলো-আর কতকাল?
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণের বিশ্বাস। যখন জনগণ আর রাষ্ট্রকে নিজের বলে মনে করে না, তখনই সমাজে নৈরাজ্য, অসহিষ্ণুতা ও হিংসা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। যখন কেউ আর প্রতিবাদ করে না, কেবল নিজের জীবনটুকু নিয়ে বাঁচতে চায়। অথচ ইতিহাস বলে, এ ধরনের সমাজেই একদিন সহিংসতা এমন মাত্রায় পৌঁছায়, যেখানে হত্যা আর শিরোনাম হয় না, হয়ে ওঠে দৈনন্দিন ঘটনা।
আজ তাই সময় খুবই সংকটময়। রাষ্ট্র ও রাজনীতি যদি এখনই শুদ্ধির পথে না হাঁটে, আইনের শাসনকে সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠা না করে, যেখানে অপরাধীর পরিচয় কেবল ‘অপরাধী’ সে যেই হোক না কেন, তাহলে অচিরেই আমরা এমন এক বাংলাদেশে প্রবেশ করব, যেখানে হত্যাই হবে স্বাভাবিক, ন্যায়বিচার হবে কিংবদন্তি, আর জীবিতরাই একদিন নিজের মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে।
Leave a Reply