
নিজস্ব প্রতিনিধি
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় সরকারি খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ১৬টি চালকলের কাছ থেকে ৪৯ টাকা কেজি দরে মোট ৩৫৯ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, চুক্তিবদ্ধ কয়েকটি চালকল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা অচলপ্রায় থাকা সত্ত্বেও তাদের নামেই সরকারি খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ দেখানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, উপজেলার একাধিক চালকলের মালিক নিজেরা মিল পরিচালনা না করে অন্য ব্যক্তির কাছে ভাড়া দিয়েছেন। এসব স্থানে বর্তমানে ধান শুকানো ও স্টক ব্যবসা হলেও নিয়মিত চাল উৎপাদনের কার্যক্রম নেই। ফলে ওইসব মিলের নামে সরকারি খাদ্যগুদামে সরবরাহ করা চালের প্রকৃত উৎস নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, নিয়মিত উৎপাদন না থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি মিল সরকারি চাল সংগ্রহ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট এলএসডি কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে বন্ধ বা অচলপ্রায় চাতালের নামেও চাল গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি চালকল ঘুরে দেখা যায়, অনেক মিলেই উৎপাদন কার্যক্রমের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন নেই। কোনো কোনো চাতালের চিমনির মাথায় ঘাস জন্মেছে, কোথাও মিল ভবন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। অনেক স্থানে ম্যানেজার, শ্রমিক কিংবা কর্মচারীর উপস্থিতিও দেখা যায়নি। আবার কয়েকটি চাতাল ভাড়া দিয়ে সেখানে স্টক ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেসব মিলে নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রম নেই, সেসব মিলের নামে সরকারি খাদ্যগুদামে সরবরাহ করা চাল কোথা থেকে এসেছে? আর ভাড়া দেওয়া চাতালের নামে সরবরাহ করা চালের প্রকৃত উৎসই বা কী?
চুক্তিবদ্ধ মিল মালিকদের একজন, ভাই ভাই চালকলের মালিক আতাউর রহমান বলেন, চলতি মৌসুমে তাঁর মিলের জন্য ২১ মেট্রিক টন চালের বরাদ্দ রয়েছে। বর্তমানে উপজেলার সচল মিলের সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই ভাই চালকল, শেখ চালকল, আহসান হাবিব চালকল ও বিশ্বাস চালকল—মোট পাঁচটি চাতাল সচল রয়েছে। ব্যবসা না থাকায় অন্য অধিকাংশ চাতাল বন্ধ হওয়ার পথে।’
এ বিষয়ে বদলগাছী এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘চাতাল মালিকেরা শ্রমিক না পেলে চাতাল বন্ধ থাকে।’
অধিকাংশ চাতালে ঘাস গজিয়ে থাকা এবং নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রম না থাকার পরও কীভাবে নির্ধারিত চাল সরবরাহ করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা কোথা থেকে চাল দেবে, সেটি তাদের বিষয়।’
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘সরকার বরাদ্দ দিয়েছে। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেই বরাদ্দ দিয়েছি। চাল কীভাবে দেবে, সেটা চাতাল মালিকেরা জানেন। আমরা চাল নিতে চাই।’
তবে সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমে চুক্তিবদ্ধ মিলগুলোর বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতা, মিল সচল থাকার বিষয় এবং সরবরাহ করা চালের উৎস যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
তাদের মতে, কোনো মিল যদি নিজস্ব উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রেখেও চুক্তির আওতায় সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করে থাকে, তাহলে সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে ভাড়া দেওয়া বা অচলপ্রায় চালকলের নামে চাল গ্রহণ করা হয়ে থাকলে বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সচেতন মহলের দাবি, বদলগাছী উপজেলার ১৬টি চুক্তিবদ্ধ চালকলের প্রতিটির বরাদ্দ, বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতা, সরকারি গুদামে সরবরাহ করা চালের পরিমাণ এবং চালের প্রকৃত উৎস যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে বন্ধ বা অচলপ্রায় চালকলের নামে চাল গ্রহণ করা হয়ে থাকলে কীভাবে তা সম্ভব হলো, সে বিষয়েও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকৃত উৎস যাচাই এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ কর্মসূচিতে এ ধরনের অভিযোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
Leave a Reply