
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
টানা ১২ দিনের ভয়াবহ সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দুই চিরশত্রু দেশ-ইরান ও ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সক্রিয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে। যদিও বিরতি কার্যকরের আগেও উভয় পক্ষ একাধিকবার একে অপরের ওপর হামলা চালায়।
১৩ জুন ইরানে ইসরায়েলের প্রথম হামলার পরদিনই জবাবে ইরান ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালায়। ২১ জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে ২৩ জুন ইরান কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। এসময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে।
মৃত্যুর মিছিলে শ’য়ের ওপর মানুষ
এই ১২ দিনে ইরানে নিহত হয়েছেন অন্তত ৬০৬ জন, যাদের মধ্যে সামরিক সদস্য, পরমাণুবিজ্ঞানী ও বেসামরিক মানুষ রয়েছেন। ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির একাধিক পরমাণু স্থাপনা ও সামরিক-বেসামরিক অবকাঠামো। অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন অন্তত ২৮ জন, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মোসাদ কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা।
যুদ্ধবিরতির সূচনা ও লঙ্ঘনঃ
২৩ জুন রাতে ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। শর্ত অনুযায়ী, ইরান ২৪ জুন সকাল সাড়ে সাতটায় এবং ইসরায়েল ওই দিন সন্ধ্যা সাতটায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে। তবে এই সময়সীমার আগে-পরে দুপক্ষই আক্রমণ চালিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ইসরায়েল দাবি করে, ইরান যুদ্ধবিরতির সময়েও হামলা চালিয়েছে; আর ইরান জানায়, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়া হয়েছিল সময় শুরুর ঠিক আগে।
ট্রাম্পের ক্ষোভঃ
যুদ্ধবিরতির সময় লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একাধিকবার তিনি ইসরায়েলের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই বোমাগুলো আপনারা ফেলবেন না। এটা বড় রকমের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হবে।”
যেভাবে এলো যুদ্ধবিরতিঃ
যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা শুরু হয় কাতারে ইরানের হামলার পরপরই। হোয়াইট হাউসে ‘সিচুয়েশন রুমে’ বৈঠকের পর ট্রাম্প নেতানিয়াহু ও কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান রাজি হয়। আলোচনায় যুক্ত ছিলেন ট্রাম্পের সহকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং দূত স্টিভ উইটকফ।
মানবিক স্বস্তি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াঃ
যুদ্ধবিরতির খবরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে ইরান ও ইসরায়েলের সাধারণ মানুষ। তেহরানের রেজা শরিফি বলেন, “যুদ্ধ থেমেছে—এটাই বড় বিষয়।” তেল আবিবের আরিক দাইমান্ত আশা প্রকাশ করেন, “এটি নতুন দিনের শুরু হবে।”
চীন, রাশিয়া, ফ্রান্সসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রপ্রধান কাজা কালাস বলেন, “এই যুদ্ধবিরতি যেন একটি মোড় বদল হয়।”
হরমুজ প্রণালিতে স্বস্তিঃ
সংঘাতের সময় ইরানের পার্লামেন্ট হরমুজ প্রণালি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে যুদ্ধবিরতির পর তেহরান সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে, যা জ্বালানি বাজারে স্বস্তি এনেছে।
আবারও আলোচনার টেবিলে?
যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু আলোচনায় ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি জানান, ইসরায়েল যদি আর হামলা না চালায়, তবে তেহরান আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করবে না।
বিশ্লষকদের মূল্যায়নঃ
এই যুদ্ধবিরতি যদি টিকে থাকে, তাহলে ইসরায়েল তার প্রাথমিক লক্ষ্য-ইরানের পরমাণু স্থাপনা ধ্বংস ও সরকার পতন পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলার আগেই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো খালি করা হয়েছিল।
Leave a Reply